ভোলার গ্যাস কাজে লাগিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব: সেমিনারে বক্তারা
বরিশাল অঞ্চলে শিল্পায়নের বড় বাধাগুলোর একটি হলো জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় ভোলার গ্যাসসম্পদসহ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব।
আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ) আয়োজিত 'আগামীর বরিশাল: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়' শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিজেএর উপদেষ্টা ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল।
এতে বলা হয়, জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি হলেও বরিশাল অঞ্চলে তা ২ শতাংশেরও কম। বিসিক শিল্পনগরী থাকা সত্ত্বেও মূলধনের সংকট ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ আটকে আছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, অপার সম্ভাবনা থাকার পরও উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানা স্থাপনে পিছিয়ে বরিশাল অঞ্চল। আগামী দিনে উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্মিলিতভাবে তা বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা করে অতীতে বরিশালের উন্নয়নের কাজ থামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলকে পিছিয়ে দিয়েছে।
বরিশাল অঞ্চলের সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। ভাবতে হবে মাকদের কারণে আমাদেরই সন্তানরা বিপথগামী হচ্ছে।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে যেমন আমাদের কাজ করতে হবে, তেমনি উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে গুরুত্ব দিতে হবে ভবিষ্যতে ভালো রাজনীতিবিদ, দক্ষ ও ভালো নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। কারণ অন্যান্য জায়গার মতো রাজনীতিও নষ্ট হয়ে গেছিলো গত ১৭ বছর। ভালো ছেলেরা রাজনীতি করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। রাজনীতিবিদদের সন্তানরা রাজনীতি করতে চাচ্ছে না। এদিকে নজর দিতে হবে। কারণ ভালো নেতৃত্ব তৈরি না হলে আমরা যখন রাজনীতি করবো না তখন শূন্যতা তৈরি হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, সবাই উন্নয়নের কথা বললেও আমাদের সমন্বয় কিংবা ঐক্যের ঘাটতি রয়েছে৷ আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে হবে। সবার মধ্যে ঐক্য দরকার সবার আগে।
তিনি বলেন, রাস্তাঘাট, সেতুসহ যেসব দাবি উঠেছে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন কিছু না। কারণ প্রধানমন্ত্রী অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে জানালে কাজ করা সহজ হবে। একইসঙ্গে জরুরি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দাবি হিসেবে তুলে ধরতে হবে।
সেমিনারে দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। এজন্য পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিক হাব ও প্রসেসিং অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি ধান, মাছ, পেয়ারা ও আমড়ার মতো কৃষি ও মৎস্যপণ্যের মূল্য সংযোজন শিল্প গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া ভোলার গ্যাসসম্পদসহ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ড্রেজিং, কোল্ড চেইন স্থাপন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এখন স্থানীয়ভাবে শিল্প, জ্বালানি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে বরিশাল অঞ্চল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।
সেমিনারে 'ভিশন বরিশাল-২০৫০' নামে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। এর আওতায় নদী ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় বাঁধ, সুপেয় পানি, জ্বালানি, শিল্পায়ন, যোগাযোগ, পর্যটন, দক্ষ জনশক্তি ও জলবায়ু অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সরোয়ার, ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জামাল, পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলাল ও পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা। বিডিজেএর সভাপতি মাহবুব সৈকতের সভাপতিত্বে সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সানবির রুপল।
