সরকার বলছে ‘সরবরাহ পর্যাপ্ত’, তবু সার সংকটের অভিযোগ বাড়ছেই
দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় আমন চাষের ভরা মৌসুমে সার পেতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা। তাদের অনেকের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।
তবে সরকার বলছে, দেশের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং সারা দেশে সার সংকটের খবর নাকচ করে দিয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তা ও ডিলারদের দাবি, কৃষকেরা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সার কিনছেন। অন্যদিকে, সার মজুত করে রাখা, কৃত্রিম সংকট তৈরি ও বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে।
ডিএপি ও টিএসপি সরবরাহ নিয়ে সংকট
রাজশাহী, কুড়িগ্রাম ও নওগাঁর কৃষকেরা ইউরিয়া ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সার, বিশেষ করে ডিএপি ও টিএসপির সংকটের কথা জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে পরস্পরবিরোধী এসব দাবি সামনে এসেছে।
রাজশাহীতে কৃষকেরা বারবার ডিলারদের গুদামে গেলেও অনেক সময় সার না পেয়েই ফিরে আসছেন। কিছু গুদাম বন্ধ রয়েছে। আবার কোথাও খোলাবাজারে অনেক বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত প্রতি বস্তা টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, খোলাবাজারে সেই সার প্রায় ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১ হাজার ৫০ টাকা দামের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। একইভাবে, ডিলার পর্যায়ে ১ হাজার টাকা নির্ধারিত এমওপি সার বাইরের দোকানে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ টাকায়।
সার সংকটের কারণে সোমবার রাজশাহীর বানেশ্বরে কৃষকেরা প্রায় এক ঘণ্টা রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক অবরোধ করেন। তারা কৃত্রিম সার সংকট তৈরির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন এবং সার বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান। আশপাশের এলাকার শতাধিক কৃষক এই বিক্ষোভে অংশ নেন।
কৃষকরা জানিয়েছেন, সার না পাওয়ায় ফসল চাষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বানেশ্বরের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, 'ডিএপি ও টিএসপি সারের তীব্র সংকট রয়েছে। আমরা এসব সার পাচ্ছি না। এই দুই ধরনের সারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।'
পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কৃষক আজিম উদ্দিন জানান, নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থায় ডিএপি ও টিএসপি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কৃষকদের খোলাবাজারের দোকান থেকে বেশি দামে এসব সার কিনতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ডিলাররাও সার বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। কৃষিজমির জন্য বরাদ্দ করা সার যাতে মৎস্য খাতে সরিয়ে নেওয়া না হয়, সে জন্য নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এত অভিযোগের পরও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী বলেছেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই।
মঙ্গলবার নওদাপাড়ায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একটি সার গুদাম পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, সরকারি গুদামগুলোতে ইউরিয়া ও ইউরিয়া ব্যতীত অন্যান্য সারের পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রয়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) বাফার গুদামগুলোতে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি এবং ৮৫ দশমিক ৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে। বিএডিসির গুদামগুলোতে আরও ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি এবং ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি মজুত রয়েছে।
বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, জেলায় টিএসপির বর্তমান মাসিক বরাদ্দ ১ হাজার ৪৫ টন; সেখানে মজুত রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ টন। একইভাবে, মাসে ইউরিয়ার বরাদ্দ ৫ হাজার ৭০০ টন হলেও শুধু একটি গুদামেই প্রায় ১০ হাজার টন ইউরিয়া রয়েছে।
ইউসুফ আলী বলেন, 'সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিত ডিলারদের সার সরবরাহ করা হচ্ছে এবং তারা দোকানের মাধ্যমে তা বিক্রি করছেন।'
তিনি বলেন, বাইরে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণেও সার সংকট রয়েছে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে।
কুড়িগ্রামে সার পেতে কৃষকদের ভোগান্তির অভিযোগ
কুড়িগ্রামেও একই ধরনের মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, তারা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তা ও ডিলারদের দাবি, ভবিষ্যতে সার সংকট হতে পারে এমন আশঙ্কায় কিছু কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার কিনে রাখছেন।
ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাট ইউনিয়নের কৃষক রাশেদা বেগম জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে টিএসপি সারের জন্য ঘুরে অবশেষে এক বস্তা সার পেয়েছেন।
তিনি বলেন, এর আগে তার স্বামী ও ছেলে ডিলারের কাছে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছেন।
একই ইউনিয়নের আরেক কৃষক নুরুজ্জামান জানান, শুরুতে কৃষকদের একজনকে এক বস্তা করে সার দেওয়া হচ্ছিল। পরে পাঁচজন কৃষককে একসঙ্গে করে এক বস্তা সার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমার ইউরিয়া ও ডিএপি সার দরকার, কিন্তু দেওয়া হচ্ছে টিএসপি। জমিতে যে সার প্রয়োজন, সেটাই দিতে হবে। কিন্তু আমার প্রয়োজনের অর্ধেক সারও পাচ্ছি না।'
ডিলার পয়েন্টে চাপ বাড়ায় কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন বুধবার থেকে সার বিতরণকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। কৃষকদের আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কেনা ও মজুত না করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
প্রশাসন আরও জানিয়েছে, অবৈধভাবে সার মজুত, গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এলাকাভিত্তিক মাসিক চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার রয়েছে।
তিনি জানান, রবি মৌসুম সামনে রেখে কৃষকেরা সার কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন। কারণ, ভুট্টা, আলু ও শীতকালীন সবজি চাষের সময় সার সংকট হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
তিনি বলেন, 'সার সংকট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। রবি মৌসুম সামনে রেখে অক্টোবর ও নভেম্বরে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।'
নওগাঁর কৃষকদেরও অভিযোগ
নওগাঁর কৃষকেরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
মহাদেবপুর উপজেলার উত্তরগ্রামের কৃষক মইনউদ্দিন ৪০ বছর ধরে ছয় বিঘা জমিতে ধান চাষ করছেন। তিনি বলেন, চাষাবাদ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি জানিয়েছেন, ধানের দাম কম। তার ওপর সার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ডিলারেরা সার আটকে রেখে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আরেক কৃষক মো. বিদ্যুৎ হোসেন প্রশ্ন তোলেন, সার সংকট থাকলে খুচরা বাজারে কীভাবে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি ডিলার ও সার ব্যবসায়ীদের ওপর আরও জোরালো নজরদারির দাবি জানান।
তবে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, প্রকৃতপক্ষে সারের কোনো সংকট নেই। তার মতে, বর্তমানে ইউরিয়া ছাড়া অন্য সারের চাহিদা কম। ইউরিয়া সার পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষকেরা আতঙ্কে বেশি সার কিনছেন, বলছেন ডিলাররা
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ডিলাররা বলছেন, সার নিয়ে এমন কোনো সংকট নেই যে কৃষকদের লুটপাট বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত সার কিনতে হবে।
এর আগে ২৩ আগস্ট সার সংকটের আশঙ্কায় কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় একদল কৃষক সার ডিলারের গুদামে ঢুকে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া নিয়ে যান।
ভূরুঙ্গামারীর সার ডিলার শাহীন আহমেদ জানান, সসারের বরাদ্দে কোনো সমস্যা নেই; মূল সমস্যা হলো কৃষকদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক।
তিনি বলেন, 'সারের বরাদ্দ নিয়ে কোনো সংকট নেই। সংকট কৃষকদের মনে। সবাই ধৈর্য ধরে সরকারের বরাদ্দ অনুযায়ী সার নিলে কোনো সমস্যা হবে না।'
খুলনায় পর্যাপ্ত মজুত, তবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া নিয়ে উদ্বেগ
খুলনায় কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় বর্তমানে তাৎক্ষণিক চাহিদার চেয়েও বেশি সার মজুত রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আগস্ট মাসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৩৩৬ টন সার মজুত ছিল। এর মধ্যে ইউরিয়া ১ হাজার ৫৬১ টন, টিএসপি ১ হাজার ৩৮৬ টন, ডিএপি ৮৮৩ টন এবং এমওপি ৫০৬ টন।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চাহিদার চেয়ে সারের মজুত বেশি এবং পরিস্থিতি নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে।
তবে সম্প্রতি খুলনা থেকে পাশের জেলা সাতক্ষীরায় সার পাঠানোর একটি চেষ্টা শনাক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে সার বিতরণব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
২০ আগস্ট কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাচারিবাড়ী বাজারে কৃষি কর্মকর্তারা নয় বস্তা সার জব্দ করেন। অভিযোগ ছিল, যথাযথ মেমো ছাড়াই এসব সার অন্য জেলায় পাঠানো হচ্ছিল।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শ্রাবণী বিশ্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত মেসার্স অধিকারী ট্রেডার্সের মালিক প্রভাষ অধিকারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক হানিফ মোল্লা বলেন, 'আমাদের চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া ও অন্যান্য সার পাওয়া যাচ্ছে। ডিলারদের কাছ থেকেও সার পেতে আমরা বড় কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি না।'
সারের মজুত পর্যাপ্ত, ডিলার সংকটের কথা স্বীকার সরকারের
৯ সেপ্টেম্বর বিষয়টি সংসদেও ওঠে। সেখানে সরকার আবারও দেশে সার সংকটের দাবি নাকচ করে। তবে সার বিতরণে ঘাটতির কথা স্বীকার করে।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল ইসলাম জানান, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার দেশে সার উৎপাদন, আমদানি ও বাফার মজুত বজায় রাখছে।
বিতরণে সমস্যার পেছনে ডিলার সংকটকেও একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯ জন ডিলার পলাতক থাকায় অনেক ডিলার পয়েন্ট খালি রয়েছে। সরকার প্রায় ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, ২৯ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সার-সংক্রান্ত ২২টি ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবস্থা নিয়েছে। এ সময়ে ২০৪টি অভিযান পরিচালনা করে মোট ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
গ্যাস ও কাঁচামালের সংকটের কারণে কয়েকটি সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে ঘোড়াশাল-পলাশ ও শাহজালাল সার কারখানা স্বাভাবিকভাবে চলছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাও শিগগির উৎপাদনে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বগুড়া থেকে আমাদের প্রতিনিধি খোরশেদ আলম, খুলনা প্রতিনিধি আওয়াল শেখ এবং রাজশাহী প্রতিনিধি বুলবুল হাবিব প্রতিবেদনটির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।
