পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরেও সার সংকট, নতুন ডিলার নীতি বাস্তবায়নে ব্যাহত হচ্ছে সরবরাহ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সারের সম্ভাব্য চাহিদা ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এর বিপরীতে সরকারি মজুত রয়েছে ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন সার বেশি রয়েছে।
তবে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কয়েকটি জেলায় কৃষকেরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। কোথাও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংকটের মূল কারণ সারের মজুত নয়, বরং বিতরণ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া জটিলতা। আমন মৌসুমে সারের চাহিদা যখন বেশি, ঠিক তখনই সরকার নতুন ডিলার নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
বিদ্যমান ডিলারশিপে শূন্যতা, নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ডিলারশিপ বাতিলের গুঞ্জনের কারণে গুদাম থেকে সার তোলার পরিমাণ কমে গেছে। এতে কৃষকের কাছে শেষ ধাপে সার পৌঁছানোর সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় কৃষকদের বিক্ষোভ হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি ও মজুতদারির অভিযোগও উঠেছে, যদিও জাতীয় পর্যায়ে সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ২৭ আগস্ট 'সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬' গেজেট আকারে প্রকাশ করে। সরকারের ভাষ্য, আগের ব্যবস্থায় বৈষম্য ও বিতরণে নানা দুর্বলতা থাকায় তা পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই নতুন নীতিমালা করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি ইউনিয়নে সর্বোচ্চ তিনটি ডিলার ইউনিট রাখা যাবে। যোগ্য পুরোনো ডিলাররা বহাল থাকবেন, পাশাপাশি আরও একজন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে একজন ব্যক্তি একটির বেশি ডিলারশিপ রাখতে পারবেন না। যেসব ডিলার পয়েন্ট বর্তমানে খালি রয়েছে, সেখানেও নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
সরকার বলছে, এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো সার বিতরণব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করা এবং কৃষকদের কাছে সহজে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করা।
সময় নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
নতুন ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থা কার্যকর করা শুরু হয় এমন সময়ে, যখন আমন আবাদ চলছিল এবং সারের চাহিদা ছিল বেশি। সামনে ছিল রবি মৌসুমও।
কর্মকর্তারা জানান, ডিলার ব্যবস্থা সংশোধনের কাজ জুনে শুরু হলেও বারবার পরিবর্তনের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া গড়ায় সারের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় পর্যন্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ হামিদুর রহমান বলেন, এ সময় নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা ঠিক হয়নি।
তিনি বলেন, "দেশের প্রধান ধান ফসল আমনের আবাদ আগস্টের প্রথম থেকেই শুরু হয়। এ সময় কৃষকদের বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন হয়। ঠিক এই সময়েই নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, যা উপযুক্ত হয়নি।"
তিনি আরও বলেন, "এর ফলে পুরোনো ডিলারদের অনেকে গুদাম থেকে সার তোলা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ একেবারেই সার তুলছেন না। এ কারণেই সংকট তৈরি হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সারের চাহিদা কম থাকে—এমন সময়ে সরকারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত ছিল।
ডিলারশিপ নিয়ে গুঞ্জনে ব্যাহত বিতরণ
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নীতিতে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ডিলারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একই সঙ্গে পুরোনো ডিলারশিপ বাতিল হয়ে যাবে—এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও নীতিমালায় যোগ্য পুরোনো ডিলারদের বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ও বিদ্যমান রাসায়নিক সার খুচরা বিক্রেতাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল, তবু অনিশ্চয়তার কারণে কিছু ডিলার সরকারি গুদাম থেকে সার তোলা কমিয়ে দেন বা বন্ধ করে দেন।
কৃষিসচিব মো. সেলিম খান স্বীকার করেন, নতুন সমন্বিত নীতিমালা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ডিলারদের সার উত্তোলন ব্যাহত হয়েছে।
তিনি কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির জন্য গুজবকেও দায়ী করেন।
তিনি বলেন, "বাস্তবে সারের কোনো ঘাটতি নেই। একটি পক্ষ কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন ঘটনা তৈরি করছে। জেলা পর্যায়ে সার নিয়ে অনেক গুজব ছড়ানো হয়েছে। 'সার নেই'—এমন কথা ছড়িয়ে কৃষকদের উত্তেজিত করা হয়েছে।"
আগেই দুর্বল ছিল ডিলার নেটওয়ার্ক
নতুন নীতিমালা কার্যকরের সময় আরেকটি বড় সমস্যা ছিল—দেশজুড়ে হাজারো ডিলার পয়েন্ট আগে থেকেই খালি ছিল।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে বলেন, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের অনেকে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি ডিলার পয়েন্ট খালি হয়েছে। এসব শূন্যস্থান পূরণ এবং ডিলার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সরকার প্রায় ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
এই শূন্যতা নতুন নীতিমালার কারণে তৈরি হয়নি। তবে কৃষিবিদদের মতে, সারের চাহিদা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তখন বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন শুরু হওয়ায় আগে থেকেই দুর্বল ডিলার নেটওয়ার্ক আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
ডিলারদেরও ছিল সময় পিছিয়ে দেওয়ার দাবি
নতুন নীতিমালার সময় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)।
নীতিমালার কিছু ধারা অস্পষ্ট, বেআইনি ও পরস্পরবিরোধী—এমন অভিযোগ তুলে ব্যাখ্যা চাওয়ার পর সংগঠনটি সেপ্টেম্বরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া দুই মাসের জন্য স্থগিত রাখার আবেদন করে।
এর আগে হাইকোর্ট বিএফএর আপত্তিগুলো ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। সংগঠনটির যুক্তি ছিল, এই সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হলে আমন মৌসুম বড় ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই শেষ করা সম্ভব হবে।
এদিকে বিএফএ চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন আগস্টেই ডিলারদের নির্ধারিত সময়ে বরাদ্দের সার উত্তোলন এবং সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রির নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কম সার উত্তোলনে স্থানীয় বাজারে সরবরাহে চাপ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জুলাই ও আগস্টে ডিলাররা সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক সার উত্তোলন করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তারা সার উত্তোলন কমে যাওয়ার তথ্য সময়মতো মন্ত্রণালয়কে জানাননি। টানা দুই মাস কম সার তোলার পর স্থানীয় বাজারে ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করে।
পরে মন্ত্রণালয় মনে করে, কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে কিছু ডিলার ইচ্ছাকৃতভাবে বরাদ্দের সার তুলেননি।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর কৃষি কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কারও কারও বিরুদ্ধে প্রত্যাহার ও স্ট্যান্ড রিলিজের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কৃষিসচিব মো. সেলিম খান বলেন, রবি মৌসুম সামনে রেখে কিছু কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার মজুত করার চেষ্টা করছেন। এতে স্থানীয় বাজারে সরবরাহের ওপর আরও চাপ পড়ছে।
ভোগান্তিতে কৃষক
রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় এর প্রভাব এখন স্পষ্ট। অনেক কৃষক বারবার ডিলারের গুদামে গিয়েও সার না পেয়ে ফিরে আসছেন।
অনুমোদিত ডিলার নেটওয়ার্কের বাইরেও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত প্রতি বস্তা টিএসপির দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও খোলা বাজারে তা প্রায় ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে কৃত্রিম সার সংকটের অভিযোগ তুলে এবং সরবরাহ বাড়ানোর দাবিতে বানেশ্বর ও আশপাশের এলাকার শতাধিক কৃষক প্রায় এক ঘণ্টা রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক অবরোধ করেন।
জাতীয় পর্যায়ে সারের ঘাটতি নেই
তবে সরকারি হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
সরকার চলতি সপ্তাহে সংসদে জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সম্ভাব্য চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার টন। এর বিপরীতে প্রস্তুত সরবরাহ রয়েছে ৫১ লাখ ৭১ হাজার টন, অর্থাৎ সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন বেশি।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার দেশীয় উৎপাদন, আমদানি ও বাফার স্টক বজায় রাখছে।
এসব তথ্য কর্মকর্তাদের ও খাতসংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত মূল সমস্যাটিই ফুটিয়ে তুলছে—জাতীয় পর্যায়ে সার রয়েছে, কিন্তু ডিলার নেটওয়ার্কে বিঘ্নের কারণে তা সবসময় ঠিকভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
তদারকি জোরদার করেছে সরকার
সার বিতরণ স্বাভাবিক রাখতে তদারকি ও অভিযান জোরদার করেছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২৮ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি ১ হাজার ৭০০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে এবং চারজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দেশের ৬৪ জেলাতেই নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, কৃষি মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে আগে থেকেই চাপে থাকা বিতরণব্যবস্থাকে আরও ব্যাহত না করে নতুন ডিলার ব্যবস্থায় রূপান্তর ভালোভাবে সম্পন্ন করা।
