আশুলিয়ায় দম্পতি ও নবজাতকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার ১; পরকীয়ার জেরে হত্যা, বলছে পিবিআই
ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়ায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে এক নবজাতকসহ স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মনিরুজ্জামান হৃদয় নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দাবি করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, নিহত নাজমা খাতুনের বিয়ের আগে থেকেই হৃদয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এরই জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন হৃদয়। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তার কাছ থেকে নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্স উদ্ধার করা হয়েছে।
আজ বুধবার রাজধানীর উত্তরায় পিবিআইয়ের ঢাকা জেলা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই জানায়, নাজমা খাতুনের সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানার পর তার স্বামী আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়। এই বিরোধের জেরেই এ হত্যার ঘটনা ঘটে।
জামগড়া এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি ঘর থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ তালাবদ্ধ ঘরটির দরজা খুলে ভেতর থেকে পোশাকশ্রমিক নাজমা খাতুন (৩৯), আলমগীর কবির (৪৫) ও সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি নবজাতকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে।
আলমগীরের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে। নাজমাও একই উপজেলার বাসিন্দা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। মামলার পর থেকেই ঘটনাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই ঢাকা জেলা। পরে মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর সংস্থাটি স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা নিহতদের পূর্বপরিচিত ব্যক্তি, সম্পর্ক ও চলাফেরার তথ্য যাচাই শুরু করেন। সেই তদন্তের একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের বিষয়ে তথ্য পায় পিবিআই। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, আলমগীর ও হৃদয় আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। আলমগীর কর্মহীন ছিলেন এবং হৃদয় তরকারির ব্যবসা করতেন। তাদের বাসার দূরত্বও ছিল হাঁটা পথে প্রায় ১০ মিনিট।
পিবিআই বলছে, আলমগীরের সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই নাজমার সঙ্গে হৃদয়ের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়।
ঘটনার দিন হৃদয়ের বাসায় গিয়েছিলেন নাজমা ও আলমগীর। সেখান থেকে তারা হৃদয়কে তাদের বাসায় নিয়ে যান। বাসায় পৌঁছানোর পর নাজমার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে হৃদয়কে মারধর শুরু করেন আলমগীর। নাজমা তাকে ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন হৃদয়।
পিবিআইয়ের দাবি, এ সময় হৃদয়ও প্রতিরোধ করেন। একপর্যায়ে তিনি নাজমার পেটে লাথি মারেন। এতে নাজমা পড়ে যান ও তার গর্ভের সন্তান মারা যায় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন হৃদয়।
জবানবন্দিতে হৃদয়ও আরও বলেছেন, এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে তাকে আঘাত করেন। তখন তাদের মধ্যে আবার ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে হৃদয় গামছা দিয়ে আলমগীরের গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
পিবিআই জানিয়েছে, মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের বিরুদ্ধে এর আগেও হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে নাম এসেছে। ২০২২ সালে আশুলিয়া থানায় করা একটি হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ পিপিএম বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই তারা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ছায়া তদন্ত চালিয়ে আসছিলেন।
"আমরা ভিকটিমদের পূর্বে কার সঙ্গে সম্পর্ক এবং চলাফেরা ছিল, তা নির্ণয় করে যাচাই করি। সর্বশেষ ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে আসামিকে গ্রেপ্তার এবং আলামত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি," বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, "এ ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে।"
মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই আনিসুর রহমান।
