ভাগাড়ের দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমাধান খুঁজছে চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের আনন্দবাজারের টিজি কলোনির বাসিন্দা নার্গিস বেগমের পরিবারে প্রায় সারা বছরই ডায়রিয়ার সমস্যা লেগে থাকে। তার দুই সন্তানেরও চোখে জ্বালাপোড়া ও অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে।
এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট থাকায় বাধ্য হয়ে গভীর নলকূপের পানি পান করেন তারা। বাইরে থেকে ২০ লিটারের জারের পানি কিনতে প্রতিবার ৫০ টাকা খরচ হয়, যা নিয়মিত বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন।
নার্গিসের পরিবার একা এই সমস্যার ভুক্তভোগী নয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩,২০০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন সংগ্রহ করে প্রায় ২,২০০ টন। ফলে প্রায় ১,০০০ টন বর্জ্য থেকে যায় ব্যবস্থাপনার বাইরে।
চট্টগ্রামের দুটি উন্মুক্ত ডাম্পিং গ্রাউন্ড (ভাগাড়)—আনন্দবাজার ও আরেফিন নগরকে ঘিরে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণাতেও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সিটি কর্তৃপক্ষ এখন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের দিকে নজর দিচ্ছে।
২০২৫ সালে দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দুটি ডাম্পিং গ্রাউন্ডের ১০০ মিটারের মধ্যে বসবাসকারী ১৭০টি পরিবার এবং ৮০ জন বর্জ্য সংগ্রহকারীর ওপর জরিপ চালানো হয়। গবেষণার স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য উত্তরদাতাদের নিজস্ব বক্তব্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয় এবং শিশুদের তথ্য দেন তাদের অভিভাবকরা।
গবেষণায় ল্যান্ডফিলসংলগ্ন প্রাপ্তবয়স্ক বাসিন্দাদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ খুব ঘনঘন চোখে তীব্র জ্বালাপোড়ার কথা জানিয়েছেন। হেপাটাইটিস বা জন্ডিসের কথা জানিয়েছেন ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মাথাব্যথার কথা ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
শিশুদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। অভিভাবকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ল্যান্ডফিলসংলগ্ন এলাকার আক্রান্ত শিশুদের ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশের বমি, ৬২ দশমিক ৯ শতাংশের ডায়রিয়া এবং ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশের শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের সমস্যার কথা জানা গেছে। চোখে জ্বালাপোড়া ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুর হার ছিল ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ।
২০২৪ সালে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় আনন্দবাজার ও আরেফিন নগরের আশপাশের ভূগর্ভস্থ পানির নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়, পানির মানের কয়েকটি সূচক সুপারিশকৃত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. সুশান্ত পাল বলেন, অবৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মাটি, পানি ও বায়ু—তিন মাধ্যমেই দূষণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তার মতে, বর্জ্যে থাকা সীসা ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক লিচেটের মাধ্যমে মাটি ও পানিতে যেতে পারে। সেখান থেকে ফসল, মাছসহ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব পদার্থ মানুষের শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি সীসার সংস্পর্শে স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দূষিত পানির সংস্পর্শে ত্বকে অ্যালার্জি ও কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিসের মতো সমস্যাও হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, "বর্জ্য থেকে তৈরি মাইক্রোপ্লাস্টিক পানি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে মাছসহ জলজ প্রাণীর মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে।"
মাটির উর্বরতা কমছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক
স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি ল্যান্ডফিলের প্রভাব পড়ছে আশপাশের কৃষিজমিতেও। গবেষণায় আনন্দবাজারের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আরেফিন নগরের ৮০ শতাংশ বাসিন্দা জানিয়েছেন, বর্জ্যের বিষাক্ততার কারণে আশপাশের মাটির উর্বরতা কমছে।
এর বাস্তব চিত্রও দেখা যাচ্ছে আনন্দবাজারের পাশের কৃষিজমিতে।
২০২৬ সালের আরেকটি গবেষণায় দুটি ডাম্পিং গ্রাউন্ডের আশপাশের মাটি, সেচের পানি ও পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়, ডাম্পিং গ্রাউন্ডের কাছাকাছি এলাকায় সীসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি।
প্রায় ১১ একর জমিতে চাষাবাদ করান হামিদ হাসান আলভী। তার দাবি, বছরে জমিতে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা খরচ করেও মূল খরচ উঠে আসে না। ল্যান্ডফিল থেকে বের হওয়া লিচেট জমিতে ঢুকে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
বর্ষায় বৃষ্টির পানির সঙ্গে লিচেটের প্রবাহ বাড়লে অনেক সময় পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে আগামী বছর থেকে বর্ষায় চাষ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
আলভীর দাবি, তার মতো আশপাশের কৃষকদের প্রত্যেকের প্রায় ২ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে। এসব জমিতে টমেটো, পুঁইশাক, পাটশাক ও ফুলকপিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়।
এদিকে কৃষিশ্রমিক জমিলা বেগম জানান, ল্যান্ডফিল থেকে চুইয়ে পড়া পানি জমিতে ঢোকার পর সেখানে কাজ করতে গিয়ে তার হাত-পায়ে ঘা, চুলকানি ও চোখে জ্বালাপোড়ার সমস্যা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, শুধু ফসল নয়, জমি ও মাঠের আশপাশের ঘাসও দূষিত হচ্ছে। এসব ঘাস খেয়ে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর শরীরে ক্ষতিকর পদার্থ প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। পরে মাংস, দুধ ও ডিমের মাধ্যমে এসব পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলে ঢোকার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নয় দুই ডাম্পিং ইয়ার্ড
চট্টগ্রামের আনন্দবাজারে প্রায় ১০ একর এবং আরেফিন নগরে প্রায় ৭৩ একর জায়গায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। দুটির কোনোটিই স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নয় এবং দুটিই ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় লিচেট সংগ্রহ ও পরিশোধন, গ্যাস ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য নির্দিষ্ট সেলে রাখা এবং যথাযথভাবে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখার মতো স্যানিটারি ল্যান্ডফিলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলো পর্যাপ্তভাবে নেই।
নগর-পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বছরের পর বছর বর্জ্য জমতে জমতে ডাম্পিং ইয়ার্ডগুলো পাহাড়ের মতো হয়ে উঠছে। ক্ষতিকর উপাদান যাতে মাটির গভীরে যেতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় আস্তরণও যথাযথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের দূষণই তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের হিসাবও বারুয়া ও পরিবেশবিদ অধ্যাপক ইদ্রিস আলীর প্রাক্কলনের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। প্রায় ৭০ লাখ মহানগরবাসী এবং মাথাপিছু দৈনিক ০.৪৫ থেকে ০.৪৮ কেজি বর্জ্য উৎপাদনের হিসাব ধরে তারা প্রতিদিন ৩ হাজার ১৫০ থেকে ৩ হাজার ৩৬০ টন বর্জ্য উৎপাদনের কথা বলেছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সীমিত জনবল ও পুরোনো যন্ত্রপাতি এখনো বড় বাধা। সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনের সংখ্যা ৯টি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করা হলেও বর্জ্য বাছাইয়ের জন্য জায়গা এখনো সীমিত।
বাড়ছে বর্জ্য, বাড়ছে চাপ
২০২৬ সালে চট্টগ্রাম মহানগরের জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। বর্তমানে মাথাপিছু দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন প্রায় ০.৪৫ থেকে ০.৪৮ কেজি। সে হিসাবে প্রতিদিন মোট বর্জ্য উৎপন্ন হয় প্রায় ৩ হাজার ১৫০ থেকে ৩ হাজার ৩৬০ টন; গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫৫ টন।
এর মধ্যে সিটি করপোরেশন প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টন বর্জ্য অপসারণ করতে পারে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
চসিকের হিসাবে, মোট বর্জ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ এভাবে অপসারণের বাইরে থাকে। ২০২২ সালের বুয়েটের এক গবেষণাতেও চসিক এলাকায় উৎপাদিত বর্জ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ অপসারণ না হওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল।
অপসারণ না হওয়া বর্জ্যের একটি অংশ ড্রেন, নালা, খাল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। এতে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে বর্ষায় জলাবদ্ধতাও বাড়ে।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় বাধা। একটি ওয়ার্ডে গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ জন কর্মী থাকলেও তিন শিফটে ভাগ করলে প্রতি শিফটে থাকেন প্রায় ২৩ জন। এ জনবল দিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ, সড়ক পরিষ্কার ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ সামলানো কঠিন।
ভবিষ্যৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বড় চাপ
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের খসড়া মহানগর মহাপরিকল্পনা ২০২৫-২০৫০ অনুযায়ী, আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরে চট্টগ্রামের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ একর জমির প্রয়োজন হতে পারে।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় মোট প্রায় ৩৩৫ একর আয়তনের পাঁচটি সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি বড় ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভর না করে ৮০ থেকে ১০০ একর আয়তনের দুটি নিয়ন্ত্রিত ল্যান্ডফিলের সঙ্গে রিসাইক্লিং, কম্পোস্টিং ও রিফিউজ-ডেরাইভড ফুয়েল উৎপাদন মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে সিডিএ।
ইখতিয়ার উদ্দীন বলেন, বর্জ্য পৃথকীকরণ বাড়ি থেকেই শুরু করতে হবে। কারণ ট্রান্সফার স্টেশন ও ডাম্পিং গ্রাউন্ডে মিশ্র বর্জ্য আলাদা করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
সিটি করপোরেশন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পও এগিয়ে নিচ্ছে। জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানও পৃথকভাবে বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এসব প্রকল্প দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের মতে, চট্টগ্রামের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎসেই বর্জ্য পৃথকীকরণ, আলাদা সংগ্রহ ও পরিবহন, পুনর্ব্যবহার এবং অবশিষ্ট বর্জ্য লিচেট পরিশোধন ও গ্যাস ব্যবস্থাপনাসহ প্রকৌশলসম্মত ল্যান্ডফিলে নিরাপদে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।
