বন্দিদের হত্যার পর মরদেহে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দিতেন জিয়াউল আহসান: ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী
র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে ঢাকা থেকে গুম হওয়া বন্দিদের গভীর রাতে বরগুনার পাথরঘাটার বলেশ্বর নদীতে নিয়ে হত্যা করে লাশ নদীর গভীরে ফেলে দেওয়া হতো—এমন বর্ণনা উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শী এক সাক্ষীর জবানবন্দিতে।
সাক্ষী বলেন, 'বন্দির মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন জিয়া স্যার। কাউকে একটি গুলি, আবার কাউকে দুটি। এরপর লাশের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এভাবে একে একে হত্যার পর তারা সুন্দরবনে যেতেন। সেখানে অন্য বন্দিদের বোট থেকে বের করে নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো। এরপর সাংবাদিকদের ফোন করে ডেকে আনতেন র্যাব সদস্যরা। পরে বিভিন্ন থানায় এসব লাশ জমা দেওয়া হতো।'
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এমন বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী আব্বাস মল্লিক। আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল।
এদিন ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে দশম সাক্ষী হিসেবে আব্বাস মল্লিকের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
৬০ বছর বয়সী আব্বাস মল্লিকের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চরদুয়ানী গ্রামে। পেশায় তিনি জেলে। মাঝেমধ্যে জমিতে হালচাষও করেন। তারা তিন ভাই ও চার বোন। তার ছোট ভাইয়ের নাম আলকাছ মল্লিক।
জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক বলেন, মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন আলকাছ মল্লিক। কখনো আবার মুদিদোকানেও বসতেন। তারা যে বোটে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন, সেটির মালিক ছিলেন আলকাছ। কিছু লেখাপড়া জানা আলকাছ ২৫-২৬ বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে ছয়-সাত বছর থাকার পর চরদুয়ানীতে ফিরে আসেন। এরপর মাছ ধরার দুটি ট্রলার বা বোট তৈরি করেন। একটির দায়িত্বে ছিলেন আব্বাস, অন্যটি দেওয়া হয় জলিল মাঝিকে। তারা নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে চরদুয়ানী ও কাঠালতলীতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন র্যাব সদস্যরা। বোট মালিকদের ডেকে অভিযানে নিয়ে যেতেন তারা। যেদিন র্যাব সদস্যরা এলাকায় আসতেন, সেদিন বিকেলে সাদা পোশাকে দুজন ঘোরাফেরা করতেন। তারা দোকান মালিকদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ ও বাতি নিভিয়ে রাখতে বলতেন।
রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র্যাবের চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস এসে বরফকলের সামনে থামত। এরপর ঢাকা থেকে গাড়িতে করে আনা বন্দিদের বোটে তোলা হতো। তাদের হাত ও চোখ বাঁধা থাকত। বন্দিদের বোটে তোলার পর র্যাব সদস্যরা হোগলা রিয়াজের দোকান থেকে সিমেন্টের বস্তা ও রশি নিতেন।
আব্বাস মল্লিক বলেন, 'বন্দিদের তোলার পর তাদের বোট চালাতে বলা হতো। এরপর চরদুয়ানী হয়ে বলেশ্বর নদীতে যেতেন তারা। সেখানে আরও গভীর পানিতে যেতে বলা হতো। গভীর পানিতে গিয়ে তারা ধীরগতিতে বোট চালাতেন।'
তিনি বলেন, ট্রলারের পাটাতনের নিচের অংশকে 'খোন্দা' এবং ওপরের ছাউনিযুক্ত ঘরকে 'ব্রিজ' বলা হয়। গভীর পানিতে যাওয়ার পর বন্দিদের ব্রিজ ও খোন্দা থেকে বের করে আনতেন র্যাব সদস্যরা। ট্রলারের দুই পাশে 'সাপোর্ট' নামে একটি অংশ রয়েছে। একজন বন্দিকে বের করার পর দুই র্যাব সদস্য তাকে ওই সাপোর্টের ওপর বসিয়ে চেপে ধরে রাখতেন।
এরপরের ঘটনা বর্ণনা করে আব্বাস মল্লিক বলেন, 'ওই বন্দির মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন জিয়া স্যার। কাউকে একটি গুলি, আবার কাউকে দুটি। এরপর লাশের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এভাবে একে একে মারার পর সুন্দরবন যেতেন তারা।'
এই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সুন্দরবনে যাওয়ার পর অন্য বন্দিদের বোট থেকে বের করে 'নাটক সাজিয়ে' হত্যা করা হতো। এরপর সাংবাদিকদের ফোন করে ডেকে আনতেন র্যাব সদস্যরা। পরে বিভিন্ন থানায় এসব লাশ জমা দেওয়া হতো।
আব্বাস মল্লিক বলেন, 'বোটগুলো ধুয়ে আমরা চরদুয়ানীতে আসতাম। তবে বোট ধোয়ার সময় বন্দিদের কাটা পেট থেকে বের হওয়া নাড়িভুঁড়ি দেখতে পেতাম। মাথায় গুলি করলে মগজও বেরিয়ে আসত। এ ছাড়া বন্দিদের শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতো।'
তিনি বলেন, এরপর তারা সুন্দরবন থেকে চরদুয়ানী বরফকলে ফিরে যেতেন। তখন মেজর সাব্বির বলতেন, 'তোমাদের জিয়া স্যার ডাকেন।' এরপর মাঝিরা জিয়াউল আহসানের কাছে যেতেন। তিনি প্রত্যেককে কখনো দুই হাজার, কখনো পাঁচ হাজার টাকা দিতেন। এসব টাকা খামে করে দেওয়া হতো। আব্বাসের ছোট ভাই আলকাছও র্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন তিনি।
আব্বাস মল্লিক আরও বলেন, ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র্যাব থেকে আলকাছকে ফোন করে বলা হয়, 'জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছেন।'
তার ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাজারে আলোচনা করতেন আলকাছ। তখন অন্য বোট মালিকরা তাকে বলতেন, 'র্যাব তোমার ওপর খুব খ্যাপা।'
আব্বাস বলেন, ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র্যাবের পরিচয় দিয়ে ফোন আসার পর দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হন আলকাছ। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটা-আটটার দিকে আলকাছের স্ত্রী তাকে ফোন করে বলেন, 'মাইজা ভাই, র্যাবের ফোন পেয়ে জিয়া স্যারের সঙ্গে দেখা করতে বটতলা মানিকখালী গেছেন আলকাছ। এখন তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।'
এরপর তারা আলকাছকে খুঁজতে শুরু করেন। না পেয়ে থানায় গেলে পুলিশ তাদের আরও খোঁজ করতে বলে। পরে খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র্যাব কার্যালয়েও তার সন্ধান করেন তারা, কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি।
আব্বাস বলেন, এ ঘটনায় তারা পাথরঘাটা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে জিয়াউল আহসান ও র্যাবের নাম উল্লেখ করতে বললেও পুলিশ তা লেখেনি।
তিনি বলেন, 'আমার ভাইকে আর কোথাও খুঁজে পাইনি। হয়তো বন্দিদের মতো আলকাছকেও হত্যা করা হয়েছে। এজন্য জিয়া স্যারের বিচার চাই। আমি ওই সময় জিয়া স্যারকে দেখেছি। আজ তিনি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আছেন।'
জবানবন্দি শেষে আব্বাস মল্লিককে জেরা করেন জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান।
