২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে
৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে উন্মুক্ত ব্যালটে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। দুপুর ২টা ১০ মিনিটে শুরু হওয়া ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ অধিবেশন কক্ষেই ভোট গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোটের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসন শূন্য থাকায় এবারের নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার যোগ্য। ভোটগ্রহণ শুরুর পর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মো. হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ভোট দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোট দেন। পরে মির্জা ফখরুল বিরোধীদলীয় সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
ভোটগ্রহণ শুরুর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটদানের পদ্ধতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে বক্তব্য দেন। তিনি এ নির্বাচনের নির্বাচন কর্মকর্তা ও প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সিইসি বলেন, সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী এবার দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বাংলা বর্ণমালার আদ্যক্ষর অনুযায়ী ব্যালট পেপারে প্রথমে রয়েছে অলি আহমদের নাম। তাঁর প্রস্তাবক বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান এবং সমর্থক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আলামিন। দ্বিতীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রস্তাবক সংসদ সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এবং সমর্থক সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
প্রতিটি ব্যালট পেপারের দুটি অংশ রয়েছে—একটি পাল্টা অংশ এবং অন্যটি মূল ব্যালট অংশ। পাল্টা অংশে ক্রমিক নম্বর, সংসদ সদস্যের নাম এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে দেওয়া নির্বাচনী এলাকার নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। ব্যালট গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে পাল্টা অংশে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করতে হবে।
ব্যালট পেপারের ডান পাশে বাংলা বর্ণানুক্রমে দুই প্রার্থীর নাম ছাপা হয়েছে। পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দিতে হবে। এরপর ব্যালট নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হবে।
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই ভোট গণনা শুরু হবে। বৈধ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। সিইসি সংসদে ফল ঘোষণা করার পর নির্বাচন কমিশন সরকারি গেজেটের মাধ্যমে তা প্রকাশ করবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগও কার্যত নেই। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ চলে যাবে।
এবারের ৩৪৯ ভোটারের মধ্যে বিএনপির ২৪৭ জন, জামায়াতের ৭৭ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির আটজন, আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলন বিএনপির মিত্র। সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন শিবিরে ২৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ১১ দলীয় বিরোধী জোটের অংশ। এই জোটের সংসদ সদস্য রয়েছেন ৯০ জন। উভয় শিবিরই নিজ নিজ প্রার্থীকে ভোট দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করে দেশের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আবদুর রহমান বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১৭২ ভোট, আর বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোতে আর ভোটের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একজন মাত্র প্রার্থী থাকায় তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
গত ২৪ জুলাই মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ২ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।
এদিকে, নির্বাচিত নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান শুক্রবার সন্ধ্যায় আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বঙ্গভবনে। বৃহস্পতিবার ভোট গণনা ও ফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
