হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশই প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে বুকের দুধ পায়নি: গবেষণা
হামে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৮২ শতাংশই জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে বুকের দুধ পায়নি। এছাড়া টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ৯৭ শতাংশ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ৩৫৪ শিশুর ওপর এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে 'হামের বিস্তার ও জিনগত নজরদারি' বিষয়ক কর্মশালা এবং গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক। গবেষণার মূল ফলাফল ও তথ্য-উপাত্ত যৌথভাবে উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ছড়িয়ে পড়া হামের মূল কারণ ভাইরাসের নতুন কোনো ধরন নয়; বরং বিশ্বজুড়ে প্রচলিত অত্যন্ত সংক্রামক 'বি৩' ধরনের বিস্তার এবং টিকাদান ও মাতৃদুগ্ধের অ্যান্টিবডির ঘাটতি।
বিশেষ করে ৯ মাস বয়সের আগেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়া এবং নিয়মিত টিকাদানে অবহেলার কারণে ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ শিশু তীব্র এবং ৫৩ শতাংশ শিশু মাঝারি অপুষ্টিতে ছিল।
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো, হামে আক্রান্ত ৩৮ শতাংশ শিশু জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে বুকের দুধ পায়নি। আর গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের ৮২ শতাংশই প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে বুকের দুধ পায়নি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ এমন বয়সে হামে আক্রান্ত হয়েছে, যখন তাদের নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়সই হয়নি। ৪৩ শতাংশ শিশু তিন মাস থেকে ১ মাসের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়েছে।
বয়স ও টিকাদানের অবস্থার ভিত্তিতে ৩৪১ শিশুকে চারটি দলে ভাগ করা হয়। ৯ মাসের কম বয়সী এবং নিয়মিত হাম টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি—এমন ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়।
টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে।
এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের, অর্থাৎ ৯২ শতাংশের এবং সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের, অর্থাৎ ৭৬ শতাংশের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই ৭৬ শতাংশ হারকে দুই ডোজ টিকা পাওয়া সব শিশুর মধ্যে হাম সংক্রমণের হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণায় অংশ নেওয়া সব শিশুই সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ফলে ৭৬ শতাংশ হিসাবটি কেবল এই হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ জন সন্দেহভাজন রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও ১৬ শিশুর হাম নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকেরা। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে টিকা নেওয়ার পর কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি কিংবা ব্যক্তিভেদে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে।
তবে এসব কারণের কোনটি সংক্রমণে ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণ করা বর্তমান গবেষণার উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল না।
হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, "অবাস্তব আশ্বাসের সুযোগ নেই। টিকাদানের গতি শতভাগ বাড়ালেও হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। তবে এ সময়ের মধ্যেই সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও মাঠপর্যায়ের নজরদারির মাধ্যমে শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনার জোর প্রচেষ্টা চলছে।"
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর দিয়ে নয়, সঠিক সময়ে কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমেই হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিস্তার ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
তিনি বলেন, "২০২৪ সালের টিকাদান ক্যাম্পেইনে সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়া এবং নীতিগত গাফিলতির কারণে যে অনাক্রম্যতার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তারই ফল আজকের এই মহামারি। হাজারটা ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ বেড বসিয়ে এই মৃত্যুর ঢল থামানো যাবে না। প্রতিরোধ এবং টিকাদানই এর একমাত্র সমাধান।"
এদিকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সম্পর্কিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৯২২ জনে দাঁড়িয়েছে।
