হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২% টিকা নেয়নি, বাদ পড়া ১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ
বাংলাদেশে নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে এমন একটি দিনও যায়নি, যেদিন হাম-সংশ্লিষ্ট কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) বিশ্লেষণ করা তথ্য অনুযায়ী, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই টিকা নেয়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী।
হামের বিস্তার ও মৃত্যু কমাতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া আরও ১৬ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এশিয়ার অনেক দেশেই এখন হামের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। তবে আমাদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তারপরও এখনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, যদিও কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। কেন এখনো হামে মৃত্যু হচ্ছে, সে বিষয়ে আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি।"
তিনি বলেন, "আইইডিসিআর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে কিছু বিষয় জানতে পেরেছে। হামে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে ৯২ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি। বিভিন্ন সময়ে টিকাদানে তৈরি হওয়া ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।"
স্বাস্থ্যসচিব বলেন, "ধরুন, ২০২২, ২০২৩ বা ২০২৪ সালে ৯০ শতাংশ শিশু টিকা পেল, কিন্তু ১০ শতাংশ বাদ পড়ে গেল। পরের বছরও যদি একইভাবে কিছু শিশু বাদ পড়ে, তাহলে একটা বড় ধরনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি তৈরি হয়। আমরা মনে করছি, একটা বড় অংশ টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে।"
বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিতে নতুন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আপাতত ১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় টিকা সরকারের হাতে রয়েছে।
"আমাদের কাছে ভ্যাকসিন আছে। আপাতত ১৬ লাখ শিশু আমাদের লক্ষ্য। যারা বাদ পড়ে গেছে, তাদের আমরা এই ভ্যাকসিন দিয়ে দেব," বলেন স্বাস্থ্যসচিব।
তিনি বলেন, "আমরা এখন আবার টিকা দিতে থাকব। যেসব ছোটখাটো ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেগুলো পূরণ করব। যারা টিকা পেয়েছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনা হচ্ছে না—আমাদের কাছে এমন তথ্য-উপাত্ত আছে। এখন যারা বাদ পড়ে গেছে, সেই এলাকাগুলো চিহ্নিত করে তাদের টিকার আওতায় আনা হবে।"
স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ইউনিসেফের সঙ্গে মঙ্গলবার তাদের একটি বৈঠক রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আরও ২৫ লাখ টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৪১ কোটি টাকার টিকা পাইপলাইনে রয়েছে, যা চলতি মাসের শেষ দিক থেকে দেশে আসতে শুরু করবে।
তবে এসব টিকার সবই হামের টিকা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকার পাশাপাশি অন্যান্য টিকাও সংগ্রহ করা হবে। মোট প্রায় ১০ ধরনের টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে দেশে হামের সংক্রমণ আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন স্বাস্থ্যসচিব।
চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর ৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে লক্ষ্য করে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ অর্জনের কথা বলা হয়েছে।
তবে গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যসংখ্যার তুলনা করলে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভ্যাকসিনোলজিস্ট ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "হামের টিকার ১০০ শতাংশ কভারেজ হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত কভারেজ হয়েছে ৮১ শতাংশ। ৯৫ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় না আসায় সংক্রমণ কমছে না। আর সংক্রমণ না কমায় মৃত্যুও কমছে না।"
তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম দেখা যাচ্ছে। তাই ১০ বা ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করে ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন। অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা উচিত।
মৃত্যু বেড়ে ৯১৮
গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১৮।
এর মধ্যে সন্দেহভাজন হামে মৃত্যু হয়েছে ৮১৯ জনের এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১ হাজার ২ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০।
এ ছাড়া নতুন করে পরীক্ষাগারে ৫৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এতে দেশে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৮৯।
