জ্বালানি সংকটে সরবরাহ কম থাকায় খাতুনগঞ্জে দুই সপ্তাহে চিনির দাম বাড়ল মণে ২০০ টাকা
চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ চিনির দাম ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় চিনির দাম বেড়েছে।
খাতুনগঞ্জে দুই সপ্তাহ আগে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনি ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৩ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে চিনির দাম আরও বাড়তে পারে।
তবে বাজারসংশ্লিষ্টরা দেশে চিনির দাম বাড়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনি বুকিংয়ের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, অতীতের মতো এবারও মিলগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়াতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, "ভোগ্যপণ্যের বাজার কখনো স্থির থাকে না। অনেক সময় বুকিং বাড়ে, আবার পণ্যের সরবরাহও কমে যায়। কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে, অথচ দাম কমলে এ প্রশ্ন আসে না। চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করেই ভোগ্যপণ্যের বাজার ওঠানামা করে। এখানে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।"
উৎপাদন কমেছে, সরবরাহে টান
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। কোনো কোনো কারখানা উৎপাদনও বন্ধ রেখেছে। ফলে মিল পর্যায় থেকে বাজারে চিনির সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে পাইকারি বাজারে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং উৎপাদন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বর্তমানে অনেক কারখানা আগের মজুত থাকা চিনি বাজারে সরবরাহ করছে। কিন্তু নতুন উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেই মজুতও দ্রুত কমছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। ফলে সামনে সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
দেশের অন্যতম বড় চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা একাধিকবার ফোন করা সত্ত্বেও সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও উত্তর পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামের চিনির বাজারে একসময় বড় অংশের সরবরাহ করত এস আলম গ্রুপ। ব্যাংকের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার পর সেখানে চিনির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, চট্টগ্রামের বাজারে সরবরাহ ঘাটতির পেছনে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এখন চট্টগ্রামের বাজারে মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিনি আসছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে চিনি পরিবহনে বাড়তি খরচ হচ্ছে। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহনের এ অতিরিক্ত ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত পাইকারি বাজারের দামে প্রভাব ফেলছে।
সিন্ডিকেট নিয়ে আবারও প্রশ্ন
চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের পুরোনো অভিযোগও আবার সামনে এসেছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চিনির আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়ায় কয়েক মাস মিল মালিকদের বাজার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
পরে মিল মালিকরা কম দামে চিনি বিক্রি করে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের লোকসানে ফেলেন। অনেক আমদানিকারক বাজার থেকে সরে যাওয়ার পর ফের বাজারের নিয়ন্ত্রণ বড় মিল মালিকদের হাতে চলে যায় বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন টিবিএসকে বলেন, "চিনির বাজার নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। দেশে হাতেগোনা কয়েকটি শিল্পগ্রুপ চিনি পরিশোধন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত। সরকার চাইলে এসব কোম্পানিকে নজরদারির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।"
তিনি বলেন, "কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে চিনির বাজার ওঠানামা করাচ্ছেন। প্রশাসনের উদাসীনতায় তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।"
বাজার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে দাম বাড়লেও চিনির বাজারে প্রশাসনের তেমন অভিযান দেখা যাচ্ছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
তাদের দাবি, শুধু গ্যাস সংকটের কারণ দেখিয়ে দাম বাড়ানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি মিল পর্যায় থেকে পাইকারি বাজার পর্যন্ত সরবরাহ ও দামের তথ্য নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বলেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি চলছে।
তিনি বলেন, "চিনির দাম বাড়ার বিষয়ে এখনো আমাদের কাছে তথ্য আসেনি। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লেও এর প্রভাব খুচরা পর্যায়ে পরে দেখা দিতে পারে।"
বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
