চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে 'বকশিশের' দৌরাত্ম্য, অপারেশন থিয়েটারে নিতেও দিতে হয় ৫০০ টাকা
চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বকশিশের নামে টাকা নেওয়া, আইসিইউর অধিকাংশ পরীক্ষা বাইরে থেকে করানো, বেড সংকট, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি এবং শিশু ওয়ার্ডে রাতে চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে টিআইবি চট্টগ্রামের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গণশুনানিতে ওঠা এসব অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানানো হয়।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় 'স্বাস্থ্য খাতে চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা'- প্রতিপাদ্য নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক সংগঠন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-টিআইবি চট্টগ্রামের যৌথ উদ্যোগে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ, অভিজ্ঞতা ও মতামত নেওয়া হয়।
গণশুনানিতে নারীসহ প্রায় শতাধিক সেবাগ্রহীতা অংশ নেন। এতে অংশ নেওয়া রোগীর স্বজনরা হাসপাতালের আয়াদের বিরুদ্ধে বকশিশের নামে বিভিন্ন ধাপে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন।
তাদের দাবি, অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার সময় ৫০০ টাকা, অবজারভেশনে রাখার সময় ৫০০ টাকা এবং ছাড়পত্র নেওয়ার সময় ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
তবে এসব টাকা কারা নিয়েছেন, গণশুনানিতে কোনো কর্মীর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
রোগী ও স্বজনরা আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতালের আইসিইউতে অধিকাংশ পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হয়। বমির ওষুধ ও ইনজেকশনও অনেক সময় বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালের থার্মোমিটার সংকটের কথাও জানান তারা। পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ করেন সেবাগ্রহীতারা।
পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় হাসপাতালে তেলাপোকা ও অন্যান্য পোকার উপদ্রব বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
গণশুনানিতে হাসপাতালে সিটি স্ক্যান মেশিন স্থাপনের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি সব পরীক্ষার রিপোর্ট দ্রুত সরবরাহ এবং গাইনি ওয়ার্ডে বেসিন স্ট্যান্ড স্থাপনের দাবিও ওঠে।
শিশু ওয়ার্ডে রাতে চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ শিশু ওয়ার্ডের সেবা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রোগীর স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, রাতে সেখানে ডিউটি চিকিৎসক থাকেন না।
এছাড়া নার্সদের আচরণ ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগও করেন তারা। অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে বেড সংকটের বিষয়টিও গণশুনানিতে উঠে আসে।
রোগীর স্বজনরা জানান, বেড না পেয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের বাইরের বেডে থাকতে হচ্ছে। এসব বেডে পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থাও নেই। হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ করেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
চিকিৎসক-নার্সের সংকট নেই, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির জনবলের ঘাটতি
রোগীদের এসব অভিযোগের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট নেই। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবলের ঘাটতির কারণে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবার মানোন্নয়নে নিয়মিত চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ওয়াসা ও পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সময়মতো সহযোগিতা না পাওয়ায় কিছু উন্নয়নকাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
অস্বচ্ছতার অভিযোগে এর আগে আউটসোর্সিং কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।
হাসপাতালের ভেতরে কোনো কর্মচারীকে টাকা বা বকশিশ না দেওয়ার জন্য রোগী ও স্বজনদের সতর্ক করে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সেবাগ্রহীতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
সীমাবদ্ধতা দূর করতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করবে সনাক-টিআইবি
গণশুনানিতে সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, 'বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করতে সনাক-টিআইবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়নে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চালানো হবে।'
তিনি বলেন, 'স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। গণশুনানির মাধ্যমে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।'
স্বাগত বক্তব্যে সনাক সদস্য অধ্যাপক সঞ্জয় বিশ্বাস দেশের স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহিমূলক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সীমাবদ্ধতা থাকলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. একরাম হোসেন বলেন, 'সীমাবদ্ধতা থাকলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। রোগীদের কথা সরাসরি শোনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসছে।'
দেশের খুব কম হাসপাতালেই এ ধরনের গণশুনানির উদ্যোগ দেখা যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার। হাসপাতালের পক্ষে রোগীদের প্রশ্নের উত্তর দেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কে. এম. আশিক কামাল, সিনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন ডা. আবু সাঈদ মোহাম্মদ লুৎয়ুল কবির, সিনিয়র কনসালটেন্ট শিশু ডা. রোজিনা ইসলাম, সিনিয়র কনসালটেন্ট ইএনটি ডা. আলমগীর মোহাম্মদ সোয়েব, সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি ডা. রওশন আরা বেগম, সিনিয়র কনসালটেন্ট এইচসিইউ ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. ধৃতিমান পাল, নার্সিং সুপার মনোয়ারা বেগম, সিনিয়র স্টাফ নার্স খন্দকার রাশেদুল আলম, স্বাস্থ্য শিক্ষাবিদ মো. ফয়েজ আহমদ ও প্রধান সহকারী মফিজুল ইসলাম।
এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও সনাক সদস্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
