বিসিআইসির সফটওয়্যার কেনায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতি, বলছে সিএজির অডিট; মানছে না কর্তৃপক্ষ
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর একটি সফটওয়্যার কেনাকাটায় সরকারের প্রায় ৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি)-এর এক নিরীক্ষায় (অডিট) এই তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে বিসিআইসি এই অডিট আপত্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, অডিট টিম প্রকল্পের পরিধির পরিবর্তনগুলো বিবেচনায় আনেনি এবং বাস্তবে কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি।
সরকারি ব্যয় নিরীক্ষার দায়িত্বে থাকা সাংবিধানিক সংস্থা সিএজি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, 'ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট, ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব আ কম্প্রিহেনসিভ ওয়েব-বেসড ইন্টিগ্রেটেড বিজনেস প্রসেস অটোমেশন প্ল্যাটফর্ম' (আইবিপিএপি) নামক সফটওয়্যার কেনাকাটায় বিসিআইসি ৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছে।
২০২৫-২৬ অডিট চক্রের অধীনে বিসিআইসি-র ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষার সময় এই অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতির তথ্যটি চিহ্নিত করা হয়।
অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে সফটওয়্যারটির প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। মাত্র দুই বছরের মধ্যে সেই প্রাক্কলন সংশোধন করে ৯ কোটি ৭ লাখ টাকা করা হয়—যা মূল বরাদ্দের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি। ব্যয় বৃদ্ধির এই হারকে নিরীক্ষকেরা 'অস্বাভাবিক' বলে বর্ণনা করেছেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর হাতে আসা অডিট প্রতিবেদনের অনুলিপিতে বলা হয়েছে, যোগ্য কনসালটিং ফার্ম বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও বিসিআইসি কৃত্রিমভাবে বাজারে 'সীমিত প্রতিযোগিতা'র সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে সফটওয়্যারটি কেনা হয়েছে এবং এতে সরকারের ৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
নিরীক্ষকেরা এই কেনাকাটা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত কর্মকর্তা এবং ক্রয় অনুমোদন দেওয়া মূল্যায়ন কমিটির বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশ করেছেন। একই সাথে তারা বিধি অনুযায়ী উপযুক্ত প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন।
অডিট প্রত্যাখ্যান বিসিআইসির
অডিট সম্পর্কে টিবিএস-এর পক্ষ থেকে বিসিআইসির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, প্রথমে যে সফটওয়্যারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল তা ভিন্ন ছিল এবং পরবর্তীতে এতে আরও উন্নত ফিচার যুক্ত করার কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে যে, ক্রয় কমিটি এই সংশোধিত ব্যয় অনুমোদন করেছিল।
নিরীক্ষা দলকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক জবাবে বিসিআইসি জানিয়েছে, সফটওয়্যারটির অফিশিয়াল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৯ কোটি ৭ লাখ টাকা, যেখানে ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ চুক্তি মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। তাদের দাবি, চুক্তির মূল্য অনুমোদিত প্রাক্কলনের চেয়ে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা কম ছিল, যা ক্ষতি নয় বরং সরকারের অর্থ সাশ্রয় করেছে।
বিসিআইসি উল্লেখ করেছে, '২ কোটি ৯০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে আর্থিক ক্ষতির দাবিটি সঠিক নয়।'
সীমিত প্রতিযোগিতার অভিযোগের জবাবে কর্পোরেশন বলেছে, 'সফটওয়্যারটির দরপত্র প্রক্রিয়ায় মোট ১৬টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল, যা সীমিত প্রতিযোগিতার দাবিটিকে নাকচ করে দেয়।'
তবে সিএজি বিসিআইসির এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, বিসিআইসির এই জবাব অডিট আপত্তির সন্তোষজনক সমাধান করতে পারেনি, কারণ তাদের যুক্তিটি ভুল ব্যাখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিসিআইসির অনুমোদিত নথিতে অফিশিয়াল প্রাক্কলিত ব্যয় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই প্রাক্কলন সংশোধন করে ৯ কোটি ৭ লাখ টাকা করা হলেও, সমস্ত ফাইল যাচাই করে নিরীক্ষকেরা এই ব্যয় বৃদ্ধির সপক্ষে কোনো অনুমোদিত নথি বা দস্তাবেজ পাননি।
দরপত্রের শর্তাবলি নিয়ে প্রশ্ন
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে আইবিপিএপি সফটওয়্যারের জন্য আগ্রহ প্রকাশের অনুরোধ (ইওআই) আহ্বান করে বিসিআইসি।
যদিও এই আহ্বানে ১৬টি প্রতিষ্ঠান সাড়া দিয়েছিল, তবে মূল্যায়ন কমিটি পরামর্শকের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তীধাপের জন্য মাত্র চারটি কোম্পানিকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখে। শেষ পর্যন্ত 'ডাইনামিক সলিউশন ইনোভেটরস' এবং 'দেবনেট লিমিটেড' (জেভি)-কে এই চুক্তিটি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬-এর ধারা ১৫(২)-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যেখানে পরামর্শক সেবার সঠিক ও সম্পূর্ণ বিবরণ প্রদানের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য ক্রয়কারী সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি প্রতিযোগিতাকে অনর্থকভাবে সীমিত করে—এমন কোনো শর্তারোপ করাকেও নিষিদ্ধ করে।
অডিটের তথ্য অনুযায়ী, দরপত্রে অংশ নিতে বিডারদের গত তিন বছরের প্রতিটিতে বাৎসরিক ১৮ কোটি টাকা টার্নওভার, দরপত্র জমা দেওয়ার তারিখের আগের তিন মাসের মধ্যে ৬ কোটি টাকার লিকুইড অ্যাসেট বা তরল সম্পদ এবং 'সিএমএমআই' সার্টিফিকেশন থাকার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। নিরীক্ষকেরা বলেছেন, এই শর্তগুলো বাজারে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিয়েছে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট পছন্দের বিডারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়ে থাকতে পারে।
বিসিআইসির ব্যাখ্যা
সিএজির প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিসিআইসির আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তারা টিবিএস-কে সফটওয়্যার কেনাকাটা সংক্রান্ত বিভিন্ন ফাইল ও নথিপত্র দেখান।
কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি মূলত একটি তৈরি বা 'অফ-দ্য-শেলফ' সফটওয়্যার কেনার জন্য পরিকল্পিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ক্রয় কমিটি এবং বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞের সুপারিশের পর, এর পরিবর্তে একটি কাস্টমাইজড বা বিশেষায়িত সিস্টেম ডেভেলপ করার জন্য পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়।
কর্মকর্তারা বলেন, 'আমাদের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সফটওয়্যার তৈরির বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মতামত চেয়েছিলাম। কাউন্সিল প্রাক্কলন করেছিল যে এই প্রকল্পের ব্যয় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা হতে পারে এবং এটি সম্পন্ন করতে ৩৬ মাস সময় লাগবে। বিসিআইসি পরবর্তীতে সেই প্রাক্কলন থেকে আরও ৪.৫ শতাংশ কমিয়ে অফিশিয়াল প্রাক্কলিত ব্যয় ৯ কোটি ৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করে।'
তারা আরও যোগ করেন, প্রকল্পটি নির্ধারিত ৩৬ মাসের অনেক আগেই মাত্র ১৫ মাসের মধ্যে সম্পন্ন ও সচল করা হয়েছে এবং বর্তমানে ডেটা এন্ট্রির কাজ চলছে।
