মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সাড়ে ৬ বছরে প্রাণ গেছে ১৫,৭১২ জনের, ৫৮ শতাংশই তরুণ
বাংলাদেশে ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, নিহত ও আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই তরুণ। মোট দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ভারী যানবাহনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ৩১৪টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। মোটরসাইকেল চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছেন ৫ হাজার ৪৯৭টি ঘটনায়, যা ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ।
এ ছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনা, অর্থাৎ ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ ঘটেছে। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি দুর্ঘটনা, যা মোট দুর্ঘটনার ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পণ্যবাহী যানবাহন—যেমন ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি—মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় অংশের জন্য দায়ী। এসব যানবাহনের কারণে ৬ হাজার ৪৮১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
মোটরসাইকেল চালকদের নিজেদের কারণে ঘটেছে ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনা, যা ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাসচালকদের দায়ী করা হয়েছে ২ হাজার ১৬৪টি দুর্ঘটনার জন্য, যা মোট দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন চাকার যানবাহনের কারণে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ, সাইকেল ও রিকশার কারণে শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং পথচারীদের কারণে ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে।
আঞ্চলিক সড়কেই দুর্ঘটনা বেশি
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশি ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এসব সড়কে ৬ হাজার ৬৮৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ৪ হাজার ৭৭৩টি দুর্ঘটনা, যা ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি বা ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি বা ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোর ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা চালান।
প্রতিবেদনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বেপরোয়া চালানো, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সচেতনতামূলক প্রচারের অভাব, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ঘাটতি, সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অপ্রতুলতা এবং তীব্র যানজটকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, মোটরসাইকেল নির্মাতা ও বিপণনকারীদের বিজ্ঞাপনী কৌশল কখনো কখনো তরুণদের মধ্যে উচ্চগতিতে মোটরসাইকেল চালানোর সঙ্গে রোমাঞ্চের সম্পর্ক তৈরি করে। এর ফলে বেপরোয়া চালনায় উৎসাহ বাড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেক বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালক বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান। এতে মোটরসাইকেলের সঙ্গে এসব যানবাহনের সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে।
হেলমেট না পরা বড় কারণ
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করাকে চিহ্নিত করেছে আরএসএফ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে সুবিধাজনক ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অভাব এবং তীব্র যানজটের কারণে আরও বেশি মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ কমানো সম্ভব।
বছরের সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনা
প্রতিবেদনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে।
২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হন। ২০২১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২১৪ জনে এবং ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯১ জনে। ২০২৩ সালে ২ হাজার ৪৮৭ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০২৫ সালে ২ হাজার ৬৭১ জন প্রাণ হারান৷
আর ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তি চালু করা, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেছে আরএসএফ।
এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচার চালানো, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক প্রচার চালানো এবং মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ভাষা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুরও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
