সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ, এক বেডেই চিকিৎসাধীন আক্রান্ত ৩ শিশু
তিন দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১৪ নম্বর নন-পেয়িং ওয়ার্ডের ৫ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে ৮ বছরের শিশু ইলা মনি। একই বেডে তার সাথে ভর্তি আছে আরো দুই শিশু।
শিশু ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের অধিকাংশ বেডে দুই থেকে তিনজন শিশু ভর্তি রয়েছে। আর রোগীর স্বজনদের অনেকেই রাতে মেঝেতে বসে বা দাঁড়িয়ে রাত কাটাচ্ছেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপে সেবা দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
মিরপুরের বাসিন্দা ইলা মনি দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তিনদিন আগে তার ডেঙ্গু শণাক্তের পর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউটে নেয়া হয়, সেখানে স্যালাইন দেয়ার পর সিট খালি না থাকায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। এখানে ভর্তি হতে পেরেছে, কিন্তু আরো ছোট দুই শিশুর সাথে এক বেডে থাকতে হচ্ছে তাকে।
ইলার মা সানজিদা বেগম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'হাসপাতালে আসার আগে চিকিৎসা ও বিভিন্ন পরীক্ষায় ইলার চিকিৎসায় প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন প্রতিদিন রক্ত পরীক্ষার জন্যও ৫০০ টাকা খরচ হচ্ছে। কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে কিছু জানায়নি চিকিৎসকেরা।'
ইলার মতো দু'দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি আছে তিন বছরের শিশু লিসা। আরেক শিশু রোগীর সাথে বেড শেয়ার করতে হচ্ছে লিসাকে। আগারগাঁও তালতলার বাসিন্দা লিসার তীব্র জ্বর থেকে খিচুনি হয়েছিলো।
লিসার বাবা মোহাম্মদ লিটন জানান, ডেঙ্গু পরীক্ষায় প্রাইভেট ল্যাবে ৩ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। হাসপাতালেও প্রতিদিন রক্ত পরীক্ষায় ৫০০ টাকা করে খরচ হচ্ছে। তিনি চায়ের দোকান চালান; মেয়েটির চিকিৎসার জন্য দোকান বন্ধ রেখে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের শিশু ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বেডে দুই থেকে তিনজন রোগী শুয়ে আছে। কারো হাতে স্যালাইন লাগানো, আবার কাউকে কোলে নিয়ে স্বজনেরা ওয়ার্ডে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে ডেঙ্গু ওয়ার্ড হলেও কেউ মশারি টানায়নি।
নার্সরা জানান, গরমে এক বেডে দুই-তিনজন রোগী তাদের স্বজনেরা ফ্লোরে থাকার কারণে কেউ মশারি টানাতে চায়না। বারবার বললেও কেউ মশারি টানায় না, ফলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।
হাসপাতালের নার্সরা জানান, ওয়ার্ডে রোগীর চাপ অনেক বেশি। ২০ শয্যার নন-পেয়িং ওয়ার্ডে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত রোগী রাখতে হচ্ছে। ফলে একটি বিছানায় দুই থেকে তিনজন, কখনো চারজন শিশুকেও রাখতে হচ্ছে।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শামীমা আক্তার বলেন, 'অতিরিক্ত রোগীর কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আমাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে রোগীর সঙ্গে অতিরিক্ত স্বজন থাকলে চলাচল ও চিকিৎসা কাজ ব্যাহত হয়। শিশু রোগীদের ক্যানুলা করা অনেক কষ্টের, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ক্যানুলা করতে বেশি সমস্যা হচ্ছে।
নার্সরা বলেন, '২০ শয্যার জন্য ১২ জন নার্স থাকলেও রোগীর সংখ্যা নির্ধারিত শয্যার কয়েক গুণ হওয়ায় এই জনবল দিয়ে কাজ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, রাত ও বিকেলের শিফটে চাপ আরও বেড়ে যায়। ৩০ বেডের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ৯০ জনের বেশি রোগীও ভর্তি থেকেছে।'
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই তিন থেকে ১২ বছর বয়সী বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন এবং পেডিয়াট্রিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার ফারজানা আফরোজ মঙ্গলবার দুপুরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'বর্তমানে তিনটি শিশু ইউনিট মিলিয়ে নির্ধারিত ৩০ বেডে ৪৫ জন রোগী রয়েছে। এখনো সারাদিন বাকি আছে আরো রোগী হয়তো ভর্তি হবে। আগের দিন ছিল ৫৩ জন। এর আগের দিন ছিল ৫০ জন। কয়েকদিন ধরে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর চেয়ে অনেক বেশি থাকে।'
তিনি বলেন, 'শিশুদের জন্য নির্ধারিত শয্যা ৩০টি হলেও রোগীর সংখ্যা তার চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি থাকে। জায়গার সংকটের কারণে একটি বিছানায় তিনজন পর্যন্ত শিশুকে রাখতে হচ্ছে, যা রোগী, স্বজন এবং চিকিৎসক-নার্স সবার জন্যই অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করছে।'
ডা. ফারজানা বলেন, 'ডেঙ্গুর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের মধ্যে হামের রোগীও সামলাতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসক-নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। হামের রোগী এখন কিছুটা কমলেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে।'
তবে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকলেও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এ বছর এখন পর্যন্ত শিশু বিভাগে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যু হয়নি বলে জানান ডা. ফারজানা।
তিনি আরো বলেন, 'শিশুর ডেঙ্গু সনাক্ত হলেই প্যানিক হওয়া যাবেনা। শিশু স্বাভাবিকভাবে খেতে পারলে তাদের অনেককেই হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়িতে পর্যবেক্ষণে রাখা যায়।' ডেঙ্গু হলে পর্যাপ্ত তরল খাবার, স্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি ও লেবুর শরবত দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
তবে শিশুর অতিরিক্ত বমি, তীব্র পেটব্যথা, খেতে না পারা, পাতলা পায়খানা বা শরীরের কোথাও রক্তপাতের মতো বিপদচিহ্ন দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিশুদের মশারির মধ্যে রাখা, ফুলহাতা পোশাক পরানো এবং মশা নিয়ন্ত্রণে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬ রোগীর মৃত্যু
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, একইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১,৯৪২ জন রোগী। চলতি বছর এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৩৯ জন মারা গেছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞিপ্তিতে সকাল ৮টা পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্যের হিসাবে এ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ১,৯৪২ জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ২১৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০১ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৭৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২৯ জন, খুলনা বিভাগে ২৬৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১২০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৯৭ জন, রংপুর বিভাগে ৫৬ জন এবং সিলেট বিভাগের ৬ জন।
এরমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৯২ শিশু। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রন্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৫৯৩ শিশু, মারা গেছে ৪৪ শিশু।
এ ছাড়া, চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট ৭৭ হাজার ৬৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫,৪২৫ জন রোগী। এই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৭২ হাজার ৮ জন।
