ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩১ শিক্ষকের তালিকা ও ৭ জনের শাস্তি নিয়ে উদ্বেগ শিক্ষক নেটওয়ার্কের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা তৈরির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক'।
সংগঠনটি মনে করে, এসব পদক্ষেপ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত রবিবার (২ আগস্ট) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ ও দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সরকার-সমর্থক শিক্ষকদের একটি অংশ ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার নামে ২৩১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের সবার বিরুদ্ধে ঢালাও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি নিয়ে উপাচার্যের কাছে হাজির হয়েছেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা পরিপন্থী এবং 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩'-এর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক; কারণ রাজনৈতিক মত প্রকাশ বা সমর্থন কোনো অপরাধ নয়।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের মতে, কেবল ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ায় সহকর্মীদের প্রতি এই ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ তাদের ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ আমলের ফ্যাসিবাদী শিক্ষকদের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যারা শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতায় প্ররোচনা বা নির্দেশনা দিয়েছেন, আবাসিক হলের নিপীড়নমূলক পরিবেশকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, সহকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক অভিযোগ দায়ের করেছেন কিংবা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়েছেন—তাদের কৃতকর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অঙ্গীকার।
তবে এই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, কোনো প্রতিহিংসা কিংবা মতাদর্শগত 'শুদ্ধি অভিযান'-এর মাধ্যমে নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযুক্তরা জানিয়েছেন। এই উভয় প্রক্রিয়াই অস্বচ্ছ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ৫ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ নিশ্চিত করা; প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করা; অভিযুক্ত প্রত্যেককে অভিযোগের বিষয়ে যথাযথভাবে অবহিত করা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া; সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এবং ১৯৭৩ সালের আদেশে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া; শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ, পরিচয় বা তালিকার ভিত্তিতে নেওয়া সব ঢালাও ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহার করা।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো প্রতিহিংসা বা মতাদর্শগত শুদ্ধি অভিযানের ক্ষেত্র নয়; এটি মূলত মুক্ত জ্ঞানচর্চা ও উন্মুক্ত বিতর্কের একটি সর্বজনীন স্থান। এটি চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন রক্ষা করার একটি প্রতিষ্ঠান।
