আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা থামেনি, পাল্টেছে ধরন
দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা এখন আর কেবল বড় ধরনের অভিযানে সশস্ত্র অপরাধীদের প্রতিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সন্দেহভাজনদের ছিনিয়ে নেওয়া, গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়া কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টায় সংঘবদ্ধ জনতা ও সাধারণ মানুষের হামলার মুখে পড়ছে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে পুলিশের ওপর ৬০০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পুলিশ ৩১৭টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ ৬৬টি হামলা হয়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি করে, মার্চে ৬৩টি, মে মাসে ৫৫টি এবং জুনে ৪৯টি হামলার ঘটনা ঘটে।
কর্মকর্তারা বলছেন, একসময় এসব হামলা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অভিযান বা দুর্গম এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন প্রকাশ্য দিবালোকে এমন ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে গুজব বা সংঘবদ্ধ জনতার উসকানিতে এসব হামলা হচ্ছে, এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হচ্ছেন এবং সরকারি যানবাহন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক হামলা
গত শনিবার (২৫ জুলাই) রাত ৮টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের আমবাগান এলাকায় মাদক মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে তার সহযোগীদের হামলার মুখে পড়েন পুলিশের সদস্যরা। এ সময় ডাবলমুরিং থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মবিনুল ইসলাম ছুরিকাঘাতে আহত হন। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা না গেলেও মূল আসামি আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে ২৩ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের ডি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কে নিজ বাসার সামনে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ওসমান গনি ওরফে ফয়সালকে (৩২) কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। তার পিঠে ৪৫টি সেলাই দিতে হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এসআই মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
গত ১৯ জুলাই রাতে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের আকবর বলীরপাড়া মুছা সিরাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা থেকে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়ার পথে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়। এ সময় চার পুলিশ সদস্য আহত হন। ঘটনাস্থল থেকেই হামলায় জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল আসামি পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৩০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ।
মামলার বাদী কুতুবদিয়া থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) অমল বড়ুয়া গণমাধ্যমকে জানান, স্ত্রীর করা একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি মো. মিজানুর রহমান একটি চায়ের দোকানের সামনে অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। থানায় নেওয়ার পথে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা চার পুলিশ সদস্যকে মারধর করে হাতকড়াসহ মিজানুর রহমানকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
এর আগে ১৬ জুলাই ভোরে পাবনার সুজানগর উপজেলায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে সুজানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এক কনস্টেবল আহত হন। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের দুটি গাড়ি।
স্থানীয় থানা পুলিশের ভাষ্য, সেদিন ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ফুটবল ম্যাচ উপলক্ষে উপজেলার মথুরাপুর এলাকায় মানুষের সমাগম হয়। ওই সুযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সুজানগর উপজেলা সভাপতি আব্দুল ওহাবের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা মিছিল বা নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে দুটি গাড়িতে পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জড়ো করে আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতা-কর্মী পুলিশের ওপর হামলা চালান। এ ঘটনায় সেদিনই সুজানগর থানায় দুটি মামলা করে পুলিশ। মামলা দায়েরের পর এক নারীসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হয়েছেন। গত ২২ মে সিলেটে ছিনতাইয়ের এক সন্দেহভাজনকে আটক করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন র্যাব সদস্য ইমন আচার্য।
এর আগে ২ মার্চ ঢাকার যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদ রেলওয়ে এলাকার কাছে মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক কারবারিদের গুলিতে পায়ে আহত হন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান।
হামলার ধরনে পরিবর্তন
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ ও ২০২০ সালে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা তুলনামূলক কম থাকলেও এরপর থেকে তা বেড়েছে। ২০১৯ সালে ৫৫৫টি এবং ২০২০ সালে ৪৪৯টি হামলার ঘটনা ঘটে। পরে ২০২১ সালে ৬০৮টি, ২০২২ সালে ৬০১টি, ২০২৩ সালে ৬০৭টি, ২০২৪ সালে ৬৪৩টি এবং ২০২৫ সালে ৬০১টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। একদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, অন্যদিকে পুলিশের প্রতি ভয় কমেছে। একই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের পর মনোবল হারানো পুলিশ বাহিনীও এখনো পুরোপুরি আগের ছন্দে ফিরতে পারেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, "পুলিশের ওপর হামলার বিষয়টি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রের আইন ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ। যারা মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করেন, তাদের ওপর আক্রমণ মানে আইনকেই অস্বীকার করা এবং একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি অবমাননা ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।"
এই অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা দীর্ঘদিনের একটি প্রক্রিয়ার ফল। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা কমে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পুলিশের বিষয়ে মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তবে তা এখনো ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান নয়।
পুলিশের ওপর হামলা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এটার দুটি দিক আছে। একটি হলো, আমাদের দেশে কোনো খারাপ প্রবণতা শুরু হলে সেটার ধারা থামাতে কিছুটা সময় লাগে। একটা সময় মানুষ পুলিশের ওপর আস্থাহীনতায় ভুগছিল। ফলে তারা নানা ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছিল। তখন পুলিশও কিছুটা দুর্বল অবস্থায় ছিল। এখন এসব বিষয়ে পুলিশ সক্রিয় হয়েছে। ফলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। তারপরও দুই-একটি ঘটনা ঘটছে। তবে প্রতিটি ঘটনায় আমরা পরবর্তীতে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।"
"আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের সদস্যদেরও কিছু গাফিলতি থাকে। আমরা সবসময় নির্দেশনা দিই যে আগে যেমন তিনজন সদস্য গিয়ে একজন মাদকসেবীকে ধরে আনত, এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। আগে মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা ছিল, আবার অপরাধীদের মধ্যেও ভয় ছিল। গণঅভ্যুত্থানসহ নানা কারণে অপরাধীরা এখন অনেক বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে," যোগ করেন তিনি।
পুলিশ সদস্যদের নিরাপদে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "পুলিশ সদস্যদের বলা হয়েছে অভিযানে গেলে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করতে, পর্যাপ্ত লোকবল নিয়ে যেতে। দুই-চারজন সদস্য নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান না চালিয়ে প্রয়োজনে অভিযান কম করা হোক, তবুও ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।"
"তারপরও বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, কোনো আসামির অবস্থান জানা গেলে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয় না। তখনই হয়তো দুই-একটি ঘটনা ঘটে যায়। তবে আমরা ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করছি," যোগ করেন তিনি।
