ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ভাগাড় ও সংরক্ষিত বনে সড়ক নির্মাণ বন্ধের দাবি পরিবেশবাদীদের
গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্যের ভাগাড় বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ এবং কক্সবাজারের মহেশখালী ও চকরিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে দেশের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, এসব প্রকল্প বন ও পরিবেশ সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করছে। একই সঙ্গে এগুলো জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং হাতির চলাচলের করিডোরকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের সামনে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়। 'বিক্ষুব্ধ পরিবেশবাদীগণ' ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), মিশন গ্রিন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশে বনভূমি দখল, উজাড় ও ধ্বংসের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে এবং হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
তারা বলেন, উন্নয়নের নামে সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যানে অবকাঠামো নির্মাণের প্রবণতা বন্ধ করা না হলে দেশের অবশিষ্ট বনাঞ্চলও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
পরিবেশবাদীরা জানান, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান 'বন আইন, ১৯২৭'-এর আওতায় সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত। পাশাপাশি 'বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২' অনুযায়ী জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বা এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। তাদের দাবি, 'বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫' এবং 'পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩' অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সমাবেশে বক্তারা রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) ২০২৩ সালের গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, গত দুই দশকে গাজীপুর জেলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বনভূমি ও জলাশয় হারিয়ে গেছে। ২০০০ সালে জেলার বনভূমির পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৯৪৩ হেক্টর, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টরে।
এদিকে, কক্সবাজারের চকরিয়া ও মহেশখালীর সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন পরিবেশবাদীরা। তারা বলেন, আইইউসিএনের 'অ্যাটলাস: এলিফ্যান্ট রুটস অ্যান্ড করিডোরস ইন বাংলাদেশ' সমীক্ষায় খুটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া করিডোরকে গুরুত্বপূর্ণ হাতির চলাচলের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, চকরিয়ার খুটাখালী থেকে ঈদগড় পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার সড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশ সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত প্রায় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাতির করিডোর ক্ষতিগ্রস্ত হবে, মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়বে এবং বন উজাড় ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হবে।
সমাবেশে বেলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুমানা শারমিন শান্তা বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে বন রক্ষা জরুরি। তিনি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে এসটিএস নির্মাণের পরিবর্তে বিকল্প স্থান নির্ধারণ এবং চকরিয়ার হাতির করিডোরের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানান।
মিশন গ্রিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি বলেন, একদিকে সরকার বন সুরক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে বনের ভেতরেই এসটিএস ও সড়ক নির্মাণের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যা পরস্পরবিরোধী।
বাপার যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, সংবিধান রাষ্ট্রকে বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে। সংরক্ষিত বন ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাবেশ থেকে পরিবেশবাদীরা চার দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে এসটিএস নির্মাণ বাতিল করে বিকল্প স্থানে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, মহেশখালী ও চকরিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত সড়ক নির্মাণ বন্ধ করা এবং সংরক্ষিত বন, জাতীয় উদ্যান ও হাতির করিডোরে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
সমাবেশ শেষে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের কাছে স্মারকলিপি দেন।
