বছরের পর বছর বেতনহীন নন-এমপিও শিক্ষকরা, প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে
প্রায় এক দশক ধরে প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও নিয়মিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করে এলেও এ সময়ে একবারও কোনো বেতন পাননি অঞ্জন চক্রবর্তী।
যশোরের অভয়নগরের ভৈরব আদর্শ কলেজের শিক্ষক অঞ্জন চক্রবর্তী ২০১৫ সাল থেকে নন-এমপিও শিক্ষক হিসেবে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। বেতন না পাওয়ায় প্রায় চল্লিশ বছর বয়সী এই শিক্ষকের জীবন চলছে দুর্দশায়।
অঞ্জনের গল্প বাংলাদেশের নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজারো শিক্ষকের বাস্তবতার চিত্র, যারা বছরের পর বছর বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারের কাছ থেকে মূল বেতন ও ভাতা পেতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত হতে হয়। যারা এ ব্যবস্থার আওতায় নেই, তাদের টিকে থাকতে প্রতিষ্ঠানের সামান্য আয়, ব্যক্তিগত টিউশনি কিংবা বিকল্প পেশার ওপর নির্ভর করতে হয়।
এ পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের মনোবল ও শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, "২০১৫ সালে চাকরিতে যোগ দিয়ে এখনো কোনো বেতন পাইনি। আমার বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়। ১৪ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে পরিবারের খরচ চালাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে।"
নন-এমপিও শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে প্রচলিত ধারণারও সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, "অনেকের মধ্যে এমন একটি ধারণা আছে যে, নন-এমপিও শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তব চিত্রটা এমন নয়। এই কলেজে যোগ দেওয়ার আগে আমি একটি স্বনামধন্য ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা এবং একটি বেসরকারি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি।"
বছরের পর বছর এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকার পর এখন সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছেন অঞ্জন।
তিনি বলেন, "আমি এমপিওভুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখাও ছেড়ে দিয়েছি—যে স্বপ্নটি যেন সেই চিরচেনা 'গাজরের' গল্পের মতো, যা সামনে দেখানো হয়, কিন্তু কখনোই নাগালে আসে না। আমার সামনে এখন কেবলই এক অনিশ্চিত ও হতাশাজনক ভবিষ্যৎ।"
অঞ্জনের মতো দীর্ঘদিন ধরে বেতন ছাড়া শিক্ষকতা করছেন নোয়াপাড়া কলেজের শিক্ষক সুনীল বিশ্বাস। তিনি বলেন, "দুই যুগ ধরে বেতন ছাড়া পড়াচ্ছি। আমাদের মানবেতর জীবনের কোনো উন্নতি নেই। সরকারের দৃষ্টি আমাদের দিকে পড়ে না।"
ময়মনসিংহের একটি নন-এমপিও কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, উচ্চমূল্যের বাজারে এভাবে বেতন ছাড়া জীবনযাপন করা অত্যন্ত কঠিন।
"শিক্ষকের মতো সম্মানজনক পেশায় থেকেও যখন প্রাপ্য বেতনের জন্য আন্দোলন করতে হয়, তখন কি আর কেউ এই পেশায় আগ্রহী হবে?," প্রশ্ন রাখেন তিনি।
বেতন না পাওয়ার প্রভাব পড়ছে পাঠদানে
শিক্ষকদের আর্থিক দুর্দশা নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। তবে এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, "প্রয়োজনীয় সম্পদ ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠান হুটহাট গড়ে ওঠে। অনেক শিক্ষকই ত্যাগ স্বীকার করে পাঠদান করতে আসেন। বেতন না হলে শিক্ষাদানের মান নেমে যাওয়াটা স্বাভাবিক। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা।"
তার মতে, সরকারের উচিত গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া। যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা ঠেকাতেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নয়। বেতন ছাড়া শিক্ষকতা করাকে অমানবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, "প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণে বিলম্ব হওয়াটা স্বাভাবিক নয়। এ প্রক্রিয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় মনোনয়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বেতনবিহীন শিক্ষকতা করাটা অমানবিক।"
কয়েকটি পর্যায়ে প্রক্রিয়াকরণের কারণে হয়তো এমপিওভুক্তিতে বিলম্ব হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর কোনো যৌক্তিকতা থাকা উচিত নয়। সংশ্লিষ্টদের বিষয়টিতে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
বেশির ভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এমপিওর বাইরে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) 'বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৪' অনুযায়ী, দেশে মোট ৯২ হাজার ৩৯২টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২৬ হাজার ১০৪টি এমপিওভুক্ত। অর্থাৎ ৬৬ হাজার ২৮৭টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত নয়।
তবে এ হিসাবের সব প্রতিষ্ঠানকে এমপিও পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ এর মধ্যে কিন্ডারগার্টেন, এনজিও পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, ইবতেদায়ি ও কওমি মাদ্রাসা, কারিগরি এবং বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৮৮ হাজার। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ২৪ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানের ২৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন, ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে, ৫৩ দশমিক ৭০ শতাংশ পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানে এবং ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
এর বাইরে দেশে ৬ হাজার ৫৮৭টি কোচিং সেন্টার রয়েছে। এগুলোর প্রায় ৬৫ শতাংশই ব্যক্তি মালিকানাধীন।
শিক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দ
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এ খাতে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ।
এ বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের সমান। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার জন্য বাজেটে ২০০ কোটি টাকাও রাখা হয়েছে।
তবে এমপিও খাতের এ বরাদ্দ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বা আগের এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া বহাল রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-৩ শাখার যুগ্ম সচিব সৈয়দ এ জেড মোর্শেদ আলী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এ বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই।
তিনি বলেন, "বর্তমানে এমপিওভুক্তির বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। মন্ত্রণালয় এখনো নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। আগের সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করা হবে নাকি বহাল থাকবে, সেটিও আমরা জানি না।"
এমপিও সম্প্রসারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তির দাবি দীর্ঘদিনের।
সর্বশেষ বড় পরিসরে ২০২২ সালে ২ হাজার ৭১৬টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ২৫১টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ৬৬৫টি প্রতিষ্ঠান ছিল।
এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৭১৯টি বেসরকারি স্কুল ও কলেজকে প্রথম পর্যায়ে এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে।
স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
তবে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার সহকারী পরিচালক এস এম মোসলেম উদ্দিন টিবিএসকে জানান, "এমপিওভুক্তির কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আমরা নির্বাচনের পর আর পাইনি। অন্তর্বর্তী সরকার এ প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। এখন এটি বাতিল হবে নাকি বাস্তবায়ন হবে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমরা পাইনি।"
তবে দীর্ঘদিন ধরে এমপিওর বাইরে থাকা শিক্ষকদের দাবি, শুধু প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করলেই তাদের সংকটের সমাধান হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত যাচাই করে এমপিওভুক্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।
