অভিভাবকদের প্রি-স্কুলিং দুঃস্বপ্ন: এ খাতে নেই নীতিমালা, বাড়ছে ব্যয় ও বৈষম্য
ঢাকার শেখেরটেকের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে চার বছরের সন্তানকে ভর্তি করাতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন সীমা আক্তার। পরিচিত শিশু শ্রেণি বা 'প্লে গ্রুপ'-এর বদলে তাকে পরামর্শ দেওয়া হয় সন্তানকে 'প্রি-প্লে' ক্লাসে ভর্তি করানোর। আগে কখনো এমন শ্রেণির নাম শোনেননি তিনি।
সীমা জানান, সব মিলিয়ে তার পরিবারের মাসিক আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। পাঁচজনের পরিবারে শুধু এক সন্তানের মাসিক স্কুল ফি ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয় তাদের। শিক্ষকদের পরামর্শে সন্তানকে ভর্তি করালেও আনুষঙ্গিক খরচের চাপে এখন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
শিশুর শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপ হিসেবে প্রি-স্কুলিং দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বাভাবিক প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে বিবেচিত। তবে কার্যকর নীতিমালার অভাবে এই খাত এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন—যা ব্যয়, মান ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তদারকির এই অভাব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ছাড়াই কার্যক্রম বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে একদিকে যেমন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে শিক্ষার অসম সুযোগ।
অভিভাবকরা বলছেন, ভর্তি ফি, টিউশন, ইউনিফর্ম, পরিবহনসহ নানা খরচ মিলিয়ে প্রি-স্কুলিং ক্রমেই বোঝা হয়ে উঠেছে। আবার অনেকেই মনে করছেন, শিশুর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ির জন্য যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে, বড় স্কুলে ভর্তির প্রস্তুতি হিসেবে বা কম দূরত্বে শিশুকে নিরাপদে রেখে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে অনেকেই সন্তানকে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন।
প্রি-স্কুলিং কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষাবিষয়ক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা গ্রো ইয়োর রিডার্স-এর প্রধান নির্বাহী সাদিয়া জাফরিন বলেন, প্রি-স্কুলিং বা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা হলো প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতিকাল।
তিনি বলেন, '"প্রি-প্লে"-র মতো স্তরগুলো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামোর অংশ নয়। বেশিরভাগ সময় কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো ছাড়াই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগুলো চালু করে থাকে।'
সাদিয়া আরও বলেন, সাধারণত ৩ থেকে ৬ বছর বয়সি শিশুদের জন্য প্রি-স্কুলিং পরিচালিত হয়। এ পর্যায়ে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি খেলাধুলা, আনন্দ, অক্ষরজ্ঞান ও প্রাথমিক গণনার মাধ্যমে শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করা হয়। সাধারণত এটি দুই ধাপে বিভক্ত: ৩ থেকে ৫ বছর বয়সিদের জন্য নার্সারি বা প্লে-গ্রুপ এবং ৫-৬ বছর বয়সিদের জন্য কিন্ডারগার্টেন।
'এই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা, সামাজিকীকরণ শেখানো এবং গান, নাচ, গল্প, চিত্রাঙ্কনসহ সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা,' বলেন তিনি।
নীতিমালার অভাবে তৈরি হচ্ছে চ্যালেঞ্জ
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে সীমিত আকারে এবং ২০১৩ সাল থেকে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়।
তবে অনেক অভিভাবকই এই ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না। ফলে বেসরকারি উদ্যোগে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। কার্যকর কোনো নীতিমালা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের ফি বা মান—কোনোটার ওপরই কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেই।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সংখ্যা বর্তমানে ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার বেশিরভাগই অনিবন্ধিত। সরকার এখনও এসব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ করছে।
২০১৬ সালে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ ও নীতিগত সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে ৫৫৯টি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নেতৃত্বে গঠিত এই টাস্কফোর্সগুলোকে পাঠ্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ ও পাঠ্যবই ব্যবহারের বিষয়গুলো মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
কর্মকর্তারা বলেন, কিন্ডারগার্টেন বন্ধ করা হবে না। কারণ দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। অনানুষ্ঠানিক হিসাবমতে, প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী কিন্ডারগার্টেনে পড়াশোনা করে। যদিও এর কোনো অফিশিয়াল তথ্য নেই।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নীতিমালার আওতায় আনা হবে এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
রাজধানীর সূত্রাপুরের একটি প্রি-স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, ভাড়া করা ভবনের নিচতলায় ছোট একটি কক্ষেই চলছে শ্রেণি কার্যক্রম। দেয়ালে কার্টুন, ইংরেজি বর্ণমালা ও শিক্ষামূলক পোস্টার থাকলেও সুশৃঙ্খল পাঠদানের কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো চোখে পড়ে না। শিশুরা কেউ খেলছে, কেউ আঁকছে—তবে নেই কোনো নিয়মকানুন কিংবা বাড়তি যত্ন।
শেখেরটেকের আরেকটি স্কুলেও দেখা গেছে এমন চিত্র। সেখানে ক্লাসরুমগুলো বেশ রঙিন ও খেলার সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো। এখানে প্রি-প্লেতে শিশুকে ভর্তি করিয়েছেন মিম আক্তার। তিনি বলেন, 'ভর্তি ফি ১৫ হাজার টাকা, মাসে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে। ভেবেছিলাম খেলতে খেলতে শেখার ভালো পরিবেশ থাকবে, কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু পাচ্ছি না, উল্টো চাপ তৈরি হচ্ছে।'
অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের একটি স্কুলে প্রি-স্কুলিংয়ে ভর্তির জন্য এককালীন প্রায় এক লাখ টাকা এবং মাসিক ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা ফি নেওয়া হয়। সেখানে শিশুদের জন্য পরিকল্পিত ও খেলাধুলা-নির্ভর শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে মাসিক বেতন ৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং ভর্তি ফি ১ লাখ টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সুনির্দিষ্ট কোনো বেতন কাঠামো না থাকায় খরচের এই বিশাল তারতম্য অনেক পরিবারের জন্যই বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্যের শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শিশুদের সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ও তদারকির অভাবে খাতটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। ফলে খেলার মাধ্যমে শেখার পরিবর্তে অনেক শিশু কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষার চাপে পড়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহসান হাবিব বলেন, দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে মানসম্মত মনে না করে সন্তানদের বেসরকারি বা ইংরেজি মাধ্যম প্রি-স্কুলে পাঠাচ্ছেন। তবে 'কোয়ালিটি এডুকেশন' সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেক অভিভাবক স্কুল নির্বাচন করেন বাহ্যিক অবকাঠামো, পরিবেশ বা সামাজিক মর্যাদা দেখে।
'এই সুযোগে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠছে, যেখানে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক, বয়সভিত্তিক কারিকুলাম বা পরিকল্পিত প্রোগ্রামের অভাব রয়েছে। শিক্ষকদের দক্ষতা ও নীতিমালার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়,' বলেন তিনি।
কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ব্যয় বাড়তে থাকায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ এখন মূলত পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হচ্ছে।
গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার নামে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ ক্ষতিকর। এতে যাদের সামর্থ্য নেই, তারা শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বাদ পড়ে যাচ্ছে। 'শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার হলেও বর্তমানে অনেক শিশুই এর বাইরে থেকে যাচ্ছে।'
তবে কিছু অভিভাবক মনে করেন, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মজীবী পরিবারগুলোর দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে। অভিভাবক আকরামুল হক শিপলু বলেন, 'প্রি-স্কুলিংয়ের কারণে আমরা কাজ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি, শিশুও ভালো সময় কাটায়।'
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালইয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, সব ইংরেজি মাধ্যম বা বেসরকারি প্রি-স্কুলকে একভাবে দেখা ঠিক নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রি-প্লে শ্রেণির অন্তর্ভুক্তি অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে এবং নীতিমালার অভাবে এই স্তরের শিক্ষার মান এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ।
শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, এই ধরনের ব্যয়বহুল শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকেই সুবিধা দিচ্ছে। ফলে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান 'পথের স্কুল'-এর প্রতিষ্ঠাতা সালমা আক্তার ঊর্মি বলেন, হাজার হাজার শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চবিত্তরা অর্থ দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো শিক্ষা কিনে নিতে পারছেন।
গো ইওর রিডার্সের সাদিয়া জাহান বলেন, প্রি-স্কুলিং খাতে বাণিজ্যিক প্রবণতা বাড়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে—শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যা এবং অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক পরিবার সরকারি স্কুল এড়িয়ে চলে। আবার নামি বেসরকারি স্কুলগুলোর খরচ অনেক বেশি হওয়ায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এক সংকটে পড়ে। এই সুযোগে কম খরচের প্রি-স্কুল গড়ে উঠছে, যেখানে মান কম হলেও সামাজিক পরিচয়ের একটি বিকল্প তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগিতা ও পিছিয়ে পড়ার ভয়ে অনেক অভিভাবকই উচ্চ ব্যয় মেনে নিচ্ছেন। অথচ প্রি-স্কুলিংয়ের মূল লক্ষ্য একাডেমিক চাপ নয়, বরং সামাজিকীকরণ ও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রি-স্কুলিং খাতকে সুশৃঙ্খল করতে দ্রুত কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, ফি নির্ধারণ, মানসম্মত শিক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তা না হলে এই খাত আরও বেশি বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্যের দিকে এগিয়ে যাবে।
