জনদুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কায় এক্সপ্রেসওয়ের পান্থকুঞ্জ র্যাম্প বাতিলের দাবি
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি-পলাশী সংযোগ সড়কের অংশ হিসেবে পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় র্যাম্প নির্মাণ করা হলে শুধু হাতিরঝিলের পরিবেশ নয়, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় যানজট ও জনদুর্ভোগও বহুগুণে বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল জলাধারের ক্ষতির পাশাপাশি কাঁঠালবাগান, কাটাবন, নীলক্ষেত, পলাশী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট এলাকায় পরিবেশ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর বাংলামোটরের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মিলনায়তনে আরবান স্টাডিজ ফাউন্ডেশন, ইনটারডিসিপ্লিনারি সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল চেঞ্জ, বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন, বিআইপি ও দুনিয়াদারি আর্কাইভের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কোনো শহরের উন্নয়ন যদি শুধু মানুষের সুবিধার জন্য করা হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন নয়। কারণ, প্রকৃতি ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশের ওপর এর প্রভাবও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন 'বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন'-এর দুই সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব ও নাঈম উল হাসান।
তারা বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পান্থকুঞ্জ পার্কের আশপাশে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সেই নির্দেশনা মানেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও কাজটি বন্ধ করেনি এবং বর্তমান বিএনপি সরকারও এ বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না।
তারা আরও বলেন, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিল এলাকায় যেভাবে গাছ কাটা হয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
গোলটেবিল বৈঠকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পান্থকুঞ্জ পার্ক অংশের র্যাম্প বাতিলের দাবি জানান নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।
তিনি বলেন, এই র্যাম্প নির্মাণ হলে পান্থকুঞ্জ পার্ক, হাতিরঝিল জলাধার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও যান চলাচল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর সুবিধা মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরাই পাবেন।
দীর্ঘদিন ধরে এই র্যাম্প বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চললেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর সাড়া না পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে র্যাম্পটি বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে আগের সরকারের সময়ে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা সাদমান সাকিব বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার কোনো খোলা জায়গা বা খেলার মাঠ নেই। একমাত্র ভরসা পান্থকুঞ্জ পার্ক, যা এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও অপরিকল্পিত প্রকল্পের কারণে সংকুচিত হওয়ার মুখে। মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
পরিকল্পিত আরবান ম্যানেজমেন্ট বা নগর ব্যবস্থাপনার অভাবে ঢাকা ভয়াবহ জনদুর্ভোগের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ। তিনি বলেন, পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষা আন্দোলন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক হলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। ঢাকার পার্ক ও জলাভূমি সংরক্ষণে 'পার্ক অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অথরিটি' নামে পৃথক একটি সংস্থা গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
বিআইপির সহ-সভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, যে রাজউক ও সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা গড়ার লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব, এখন সেই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
লেখক ও চিন্তাবিদ ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্ক ও জলাধার ধ্বংসের জন্য জনগণের চেয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনাই বেশি দায়ী। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষকে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসীব চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে নগরের উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই জনস্বার্থভিত্তিক আইন ও নীতিমালার সংস্কার জরুরি।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসীব চৌধুরী, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান, লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক ফিরোজ আহমেদ, আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রদর্শনী বেঙ্গল স্ট্রিমের প্রধান কিউরেটর নিক্লাওস গ্রেবার, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আবদুল্লাহ প্রমুখ।
