মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: তদন্ত প্রতিবেদন অপ্রকাশিত, ক্ষতিপূরণ নিয়ে অসন্তোষ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে
এক বছর পেরিয়ে গেছে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার। শোকের আবহ কাটিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হলেও নিহতদের পরিবার এবং দগ্ধ হয়ে বেঁচে থাকা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের জীবন এখনো স্বাভাবিক হয়নি। রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর প্রশ্ন—তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হলো না কেন, আর সেই প্রতিবেদনই বা কেন এখনো প্রকাশ করা হয়নি?
দুর্ঘটনার পাঁচ মাস পর ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এই ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করে। তাদের অভিযোগ, এটি ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অপ্রতুল এবং সরকারের সিদ্ধান্ত তদন্ত কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কমিশন নিহত শিশুদের জন্য এক কোটি টাকা, প্রাপ্তবয়স্ক নিহতদের জন্য ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং দগ্ধদের ক্ষেত্রে আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী ১০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা কর্মসূচিরও প্রস্তাব ছিল।
কিন্তু সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শুধু ২০ লাখ ও ৫ লাখ টাকার সহায়তার ঘোষণা দেয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত সুপারিশ প্রকাশও করা হয়নি।
নিহত শিক্ষার্থী জারিফের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, 'এখন জানতে পারছি, তদন্ত কমিশন আলাদা করে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু প্রতিবেদন তো প্রকাশই করা হয়নি। আমার ছেলে আর ফিরবে না, টাকা দিয়ে কী হবে? তবে ড. ইউনূসের সরকারের কাছে এটা আমরা আশা করিনি।'
আহত শিক্ষার্থী তাওহীদের বাবা শরীফের প্রশ্ন, 'একটা দগ্ধ শিশুর মূল্য কি পাঁচ লাখ টাকা হতে পারে? তাই আমরা সেই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করিনি। যদি তদন্ত কমিশন ধাপে ধাপে চিকিৎসা ব্যয়ের সুপারিশ করে থাকে, তাহলে সেটাই বাস্তবায়ন করা হোক।'
সুপারিশ জানানো হয়নি সংবাদ সম্মেলনে
দুর্ঘটনার তদন্তে গঠিত নয় সদস্যের কমিশনের নেতৃত্ব দেন সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লা খান। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর প্রেস সচিব শফিকুল আলম সংবাদ সম্মেলনে বিমান বাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে নেওয়ার সুপারিশের কথা জানান। তবে নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত সুপারিশের বিষয়ে কিছুই বলেননি।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে বিমান বাহিনী জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত প্রশিক্ষণ বিমানের ক্ষতির পরিমাণ ৭৭ কোটি টাকারও বেশি।
প্রতিবেদন গোপন রাখার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম মনে করেন, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় ক্ষতিপূরণ বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার মতে, এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের সদিচ্ছা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিলুর রহমান খান বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের সদিচ্ছা থাকলে কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হতো। আগুনে দগ্ধদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। কমিশন যেখানে নিহতদের জন্য এক কোটি টাকার সুপারিশ করেছে, সেখানে ২০ লাখ টাকার ঘোষণায় প্রশ্ন থেকেই যায়।'
আদালতের নির্দেশের অপেক্ষায়
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ভুক্তভোগীদের অনুলিপি দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।
ব্লাস্টের আইনজীবী বনরুপা রায় বলেন, 'হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করলেও এখন পর্যন্ত সরকার তার জবাব দেয়নি। ফলে শুনানিও এগোয়নি।'
তার ভাষ্য, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দায় নির্ধারণের পরিবর্তে বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে একসঙ্গে বিবাদী করা হচ্ছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
বর্তমান সরকারের আশ্বাস
দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, ঘোষিত ক্ষতিপূরণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছেছে কি না, তা সরকার পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলোও বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আজ (২১ জুলাই) সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা স্বীকার করেন, এক বছর পরও যদি কোনো পরিবার ক্ষতিপূরণ না পেয়ে থাকে, সেটি দুঃখজনক এবং বর্তমান সরকারেরও একটি ব্যর্থতা। সরকার দ্রুত এ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করবে বলেও আশ্বাস দেন।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরুন নবী বলেন, 'দুর্ঘটনার পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও ঘোষিত আর্থিক সহায়তা বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে দগ্ধ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।'
যাদের সন্তান ও পরিবারের সদস্য মারা গেছে তাদের জন্য সরকারের আরও গঠনমূলক চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি।
