জুলাই গণহত্যার বিচারে গাফিলতিকারীদের বিরুদ্ধে হাশরের ময়দানে বাদী হিসেবে দাঁড়াব: শফিকুর রহমান
ৎৎজাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি অবহেলা, গণহত্যার বিচারে ধীরগতি, জুলাই জাদুঘর বন্ধ রাখা এবং সীমান্ত ইস্যুতে সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের ভুলে যাওয়া নিজেদের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি জানান, জুলাই গণহত্যার বিচারে কোনো ধরনের গড়িমসি বা টালবাহানা দেশের মানুষ মেনে নেবে না; এমনকি হাশরের ময়দানেও তিনি এ বিষয়ে গাফিলতিকারীদের বিরুদ্ধে বাদী হিসেবে দাঁড়াবেন।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন গণহত্যার বিচার নিয়ে বিশেষ সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, 'জুলাইয়ের গণআন্দোলন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। এই সময়ে যারা গুম হয়েছেন, নিহত হয়েছেন কিংবা শরীরে বুলেটের স্প্লিন্টার (ধাতব টুকরো) নিয়ে পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা ভোগ করছেন, তাদের ভুলে যাওয়া নিজেদের আত্মার সঙ্গে চরম ও নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতকতা। যারা মুখে জুলাইয়ের চেতনার কথা বলেন, তারাই আজ আহত ও পঙ্গু জুলাই যোদ্ধাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য করছেন।'
শফিকুর রহমান সংসদে আলোচনার সময় বণ্টন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সরকারি দল ও মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যের জবাব দিয়ে তিনি বলেন, '১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জোটের ইতিহাস সম্পর্কে না জেনেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অসত্য তথ্য উপস্থাপন করছেন, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।'
তিনি বলেন, 'ব্যাংককের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা সদ্য সাবেক সরকারের সময়েই করা হয়েছিল। অথচ বর্তমান সরকার বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও অসংখ্য আহত ও পঙ্গু মানুষ চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।' তিনি দোষারোপের রাজনীতি বাদ দিয়ে আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় তিনি প্রয়োজনে আহত যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য দেশের সব সংসদ সদস্যের সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা কর্তনের প্রস্তাব দেন এবং নিজের সংসদীয় সুযোগ-সুবিধা সবার আগে বাতিল করার ঘোষণাও দেন।
সরকারের সমন্বয়হীনতা ও ধীরগতির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা জানতে চান, সংস্কারকাজের অজুহাতে জুলাই জাদুঘর মাসের পর মাস বন্ধ রাখা হয়েছে কেন। তার মতে, সংস্কারকাজ চলমান রেখেও জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা সম্ভব ছিল। তিনি অবিলম্বে জুলাই জাদুঘর খুলে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, 'জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না—এমন তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।' তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
জুলাই গণহত্যার বিচারে সরকারের ধীরগতি এবং অভিযুক্তদের বিষয়ে সরকারের নমনীয় অবস্থানেরও সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, 'এই বিচারে কোনো ধরনের টালবাহানা বা গড়িমসি দেশের মানুষ কখনও মেনে নেবে না।' ক্ষমতার প্রভাবে যদি বিচার প্রক্রিয়ায় অবহেলা করা হয়, তাহলে হাশরের ময়দানে তিনি নিজেই গাফিলতিকারীদের বিরুদ্ধে অন্যতম বাদী হিসেবে দাঁড়াবেন বলে জানান তিনি। তবে বিচারের নামে কোনো নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেন অন্যায় বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, 'পতিত স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে অভিযুক্ত এবং তৎকালীন সরকারকে সহায়তা করা কিছু সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।'
তার অভিযোগ, যেসব গণমাধ্যম তৎকালীন সরকারকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছিল, তারা এখন আবার প্রকাশ্যে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে।
কোন শক্তির আশ্রয়ে তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, 'প্রতিবেশী দেশের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের পরও সরকারের পক্ষ থেকে দেশের সার্বভৌত্বের প্রশ্নে দৃশ্যমান কোনো কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং দেশের প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষায় ১৮ কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকবে।'
বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি ১৪ জুলাইকে একটি ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর দিন হিসেবে উল্লেখ করে সরকার ও বিরোধী দলের সব দায়িত্বশীল নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সংযত হওয়ার আহ্বান জানান।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর দুঃখ প্রকাশকে তিনি স্বাগত জানালেও ভবিষ্যতে আন্দোলনের চেতনা ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো মন্তব্য না করার বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, 'নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রশ্নে অতীতে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে বারবার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। জনগণের ভোটের মূল্যায়ন এবং তাদের রায়কে যথাযথ সম্মান জানানো না হলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অচিরেই ধ্বংসের মুখে পড়বে এবং এর দায় বর্তমান সরকারকেই বহন করতে হবে।'
