এআই ও স্মার্ট প্রযুক্তিতে সাজছে গাজীপুর: ১৬০ কোটি টাকায় শুরু হচ্ছে ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প
জননিরাপত্তা সুসংহত করা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পুলিশি সেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুর মহানগরীকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর 'সেফ সিটি' হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি), গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (জিসিসি) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় পুরো মহানগরকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আইপি ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং স্মার্ট মনিটরিং প্রযুক্তির নিশ্ছিদ্র নজরদারিতে আনা হচ্ছে।
জিএমপি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে এটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাকার আগে কেন গাজীপুর?
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে বাস্তবায়িত এই পাইলট প্রকল্প সফল হলে পরবর্তী সময়ে রাজধানী ঢাকায় একই ধরনের 'সেফ সিটি' ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বর্তমান সরকার অবাস্তব বা কাল্পনিক 'স্মার্ট বাংলাদেশ'-এর স্লোগানে বিশ্বাসী না হয়ে সরাসরি বাস্তবমুখী এবং টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী। যথাযথ অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার অংশ হিসেবেই রাজধানী ঢাকাকে সেফ সিটি হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে 'Development of Safe City in Dhaka' প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গাজীপুরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
গত ৫ জুন পুলিশ সদর দপ্তরে ডিআইজি (ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট) মো. মুশফেকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কারিগরি সাব-কমিটির পঞ্চম সভায় জানানো হয়, রাজধানীর তুলনায় কম বাজেট এবং অত্যন্ত সহজতর ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ার কারণে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে এই প্রকল্প সর্বাগ্রে কার্যকর করা সম্ভব। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে 'ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি' এবং স্থানীয় পুলিশের যৌথ সমন্বয়ে সফলভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি ও জিওলোকেশন সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যা থাকছে
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় পুরো মহানগরীকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। কারিগরি দিক থেকে এই প্রকল্পে ফেস রিকগনিশন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, যা সন্দেহভাজন বা চিহ্নিত অপরাধীদের চেহারা দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক অ্যালার্ম প্রদান করবে। এছাড়া অটোমেটিক নাম্বার প্লেট রিকগনিশন ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের অবস্থান ও গতিবিধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাক করা হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে একটি কেন্দ্রীয় 'কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার'। এআই ভিত্তিক ভিডিও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যেকোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত করবে। এর ফলে 'পুলিশ রেসপন্স ইকোসিস্টেম' চালুর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে পুলিশি সেবা পৌঁছানো সম্ভব হবে।
আগ্রহী বিশ্বসেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিশ্বের নামকরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কারিগরি কমিটির সভায় এইচকে ভিশন, হুয়াওয়ে, ডাহুয়া, এনইসি, মটোরোলা এবং ইউনিভিউ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কারিগরি সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রস্তাবিত প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য 'প্রুফ অফ কনসেপ্ট' জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কারিগরি কমিটি সিস্টেম আর্কিটেকচার ও ইকুইপমেন্ট তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ করছেন। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্মূল্যায়নের কাজও চলমান রয়েছে।
অংশীজনদের তৎপরতা
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, জিএমপি, বিআরটি এবং আইইউটি সহ বিভিন্ন অংশীজন নিবিড়ভাবে কাজ করছে। জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. তাহেরুল হক চৌহান স্থানীয় কমিউনিটির সাথে আলোচনা ও সরেজমিনে সার্ভে সম্পন্ন করেছেন। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. তাহেরুল হক চৌহান বলেন, "আমাদের মূল লক্ষ্য গাজীপুরের সাধারণ মানুষ, শ্রমিক এবং শিল্পপতিদের সম্পদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গাজীপুর দেশের একটি অন্যতম অর্থনৈতিক হাব, যেখানে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের বাস এবং ২০ লক্ষ শ্রমিকের রুজি-রুটি জড়িয়ে রয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি বিষয়টিকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, "বর্তমান সরকার প্রধান জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার। 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতি বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলার আধুনিকায়ন জরুরি। আশা করি গাজীপুরবাসী খুব দ্রুত এই আধুনিক সেফ সিটির সুবিধা লাভ করবেন।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গাজীপুর হবে দেশের প্রথম আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপদ শিল্পনগরী।
