বর্ষা এলেই কেন ডুবে যায় ঢাকা, বছরের পর বছর ড্রেনেজ প্রকল্পে বিনিয়োগেও মিলছে না সমাধান
প্রতি বর্ষায় ঢাকার চিত্র যেন ঘুরেফিরে একই থাকে। রাজধানীর সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যায়, যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে, যান চলাচল স্থবির হয়ে যায় এবং হাজারো মানুষ হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হন।
আজ রবিবার (১২ জুলাই) ভারী বৃষ্টিপাত আবারও রাজধানীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বছরের পর বছর নানা প্রকল্পে বিনিয়োগের পরও কেন বৃষ্টি হলেই ঢাকা তলিয়ে যায় এবং এই সমস্যার সমাধানই–বা করবে কে?
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপের প্রভাবে এ ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও অন্তত দুই দিন দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ১৪-১৫ জুলাইয়ের দিকে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।
বিএমডির পরিচালক মমিনুল হক বলেন, অল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত এল নিনো-সংশ্লিষ্ট জলবায়ুগত পরিবর্তনেরও প্রভাব নির্দেশ করে। একই ধরনের আবহাওয়ার ধারা ভারত, চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও দেখা যাচ্ছে।
কেন সহজেই জলাবদ্ধ হয় ঢাকা
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ভারী বৃষ্টিপাতই এ সমস্যার কারণ নয়।
বছরের পর বছর খাল দখল, জলাভূমি ভরাট, প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষম এলাকা ধ্বংস, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং ড্রেনেজ চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে এখন মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপ সামলাতে পারছে না।
কোটি কোটি টাকা ব্যয়, উন্নতি সামান্য
গত চার বছরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২৬২ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করেছে। এ সময়ে ৩৩৪ কিলোমিটারের বেশি ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে।
তারপরও প্রায় প্রতিবার ভারী বৃষ্টির পরই রাজধানীবাসীকে তীব্র জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করে এ সংকটের সমাধান হবে না। এর জন্য রাজধানীর প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার জলাধার
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০১৯ সালের এক গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আগের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি-২০১০) প্রণয়নের পর থেকে ঢাকা নির্ধারিত বন্যাপ্রবাহ এলাকা, রিটেনশন পুকুর ও জলাশয়ের ৩ হাজার ৪৪০ একর হারিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি চিত্র আরও উদ্বেগজনক।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ এলাকা ছিল জলাশয়। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশে।
একই সময়ে সবুজ এলাকার পরিমাণ ২২ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একসময় এসব প্রাকৃতিক জলাশয় বৃষ্টির পানি শোষণ করত। এখন সেসব জায়গা না থাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
খাল পুনরুদ্ধারই কি সমাধান?
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) ২০২৪ সালের এক গবেষণা বলছে, এর উত্তর অনেকটাই ইতিবাচক।
গবেষণা অনুযায়ী, দখল হওয়া মাত্র ১৫টি খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ পুনরাবৃত্ত জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব।
পুনরুদ্ধারের জন্য চিহ্নিত খালগুলোর মধ্যে রয়েছে- রূপনগর প্রধান খাল, বাউনিয়া খাল, বাইশটেকি খাল, সাংবাদিক কলোনি খাল, কল্যাণপুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, পান্থপথ বক্স কালভার্ট খাল, রায়েরবাজার খাল, জিরানি খাল, রামপুরা খাল, দোলাই খাল, কদমতলী খাল এবং মান্ডা খাল।
গবেষণায় রাজধানীর জলাবদ্ধতার ৯টি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- মিরপুর, পল্লবী, ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, রামপুরা, বাড্ডা, পুরান ঢাকা ও জুরাইনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার জন্য কোনো একক সংস্থা দায়ী নয়; বরং এর দায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের।
তাদের মতে, সিটি করপোরেশন, পানি-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, উন্নয়ন সংস্থা এবং বিভিন্ন ইউটিলিটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রায়ই বিলম্বিত হয়।
এ ছাড়া খাল দখল, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়া, অবকাঠামো নির্মাণকাজে বিলম্ব এবং যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা রাজধানীর জলাবদ্ধতা সংকটকে আরও তীব্র করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রেনেজ অবকাঠামো সড়ক, ইউটিলিটি সেবা ও নগর পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমই ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রতিবার ভারী বৃষ্টির পর জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে ঢাকার জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ড্রেনেজ কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তারা দখল হওয়া খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, রাজধানীর অবশিষ্ট বন্যার পানি ধারণক্ষম এলাকা সংরক্ষণ, ড্রেন যাতে আবর্জনায় বন্ধ না হয় সে জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, টেকসই নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু, ড্রেনেজ ও নগর উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান ড্রেনেজ অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সুপারিশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে যতই নতুন ড্রেন নির্মাণ করা হোক না কেন, প্রতি বর্ষাতেই ঢাকাকে তীব্র জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হবে।