৫ বছরের মন্দা কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের মোটরসাইকেল বাজার
টানা ৫ বছরের মন্দার পর দেশের মোটরসাইকেল শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ২০২০ সালে ৬ লাখ ২৫ হাজারের বেশি ইউনিটের যে বাজার ছিল, করোনা মহামারি ও দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তা নেমে এসেছিল মাত্র ৩ লাখ ৯২ হাজার ৬১০ ইউনিটে। তবে সর্বশেষ শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরে মোটরসাইকেল বিক্রি ৮ শতাংশের বেশি বেড়ে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৩০৪ ইউনিটে পৌঁছেছে।
দেশের বাজারের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি মোটরসাইকেল শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ১০ বছর আগেও দেশের মোটরসাইকেলের ৯৫ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ হতো বিদেশ থেকে তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির মাধ্যমে। এখন দেশের সড়কে চলাচল করা প্রায় ৯৯ শতাংশ মোটরসাইকেলই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কিংবা অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্টগুলো (সংযোজন কারখানা) থেকে সরবরাহকৃত।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৮ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ লাখ ইউনিট। তাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ হিসেবে রপ্তানি বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে।
ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশীয় বাজার
করোনা মহামারি ও পরবর্তী সময়ের দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কা কাটিয়ে দেশের মোটরসাইকেল বাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫ বছরের মন্দা কাটিয়ে ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল বিক্রি আবারও বেড়েছে। ২০২১ সালে করোনা মহামারির কারণে বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। এরপরের তিন বছর ডলার সংকট, অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে সরকারি বিধি-নিষেধ এবং ব্যাংকগুলোর ঋণপত্র (এলসি) খুলতে অনীহার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্ন হয়।
তবে গত এক বছরে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় পরিস্থিতির উন্নতি এবং ব্যাংকগুলোর এলসি খোলা পুনরায় শুরু হওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক হতে থাকে। একই সঙ্গে মন্দার কারণে দীর্ঘদিন কেনাকাটা স্থগিত রাখা অনেক ক্রেতাও বাজারে ফিরেছেন। ফলে বিক্রিও বাড়তে শুরু করে।
বাজার পুনরুদ্ধারে এগিয়ে হোন্ডা ও ইয়ামাহা
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইয়ামাহা ৮৮ হাজার ২৮৯টি মোটরসাইকেল বিক্রি করে ২০ দশমিক ৮ শতাংশ বাজার দখল করে। অন্যদিকে হোন্ডা বিক্রি করেছে ৮৪ হাজার ৮১৩টি মোটরসাইকেল। সে হিসাবে তাদের বাজার অংশীদারিত্ব প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।
গত জুনে দেশের সর্বাধিক বিক্রিত মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড ছিল হোন্ডা। ওই মাসে মোট বিক্রির ২০ দশমিক ২ শতাংশ ছিল হোন্ডার দখলে, যেখানে ইয়ামাহার অংশ ছিল ১৮ শতাংশ।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, তুলনামূলক সাশ্রয়ী দাম এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী মডেলের কারণে হোন্ডা ও ইয়ামাহার মোটরসাইকেল ক্রেতাদের কাছে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে।
এদিকে সুজুকি, হিরো এবং বাজাজেরও ৮ থেকে ১১ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে সুজুকির অংশীদারিত্ব ১৯ দশমিক ০৮ শতাংশ, হিরোর ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বাজাজের ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
নীতিগত সহায়তা ও রাইড-শেয়ারিংয়ের ভূমিকা
২০১৬-১৭ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল সংযোজন শিল্পকে উৎসাহ দিতে সম্পূর্ণ খুলে আনা মোটরসাইকেলের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে সরকার। এরপর থেকেই খাতটি দ্রুত প্রসারিত হতে শুরু করে।
এরপর রাইড-শেয়ারিং সেবার দ্রুত বিস্তার মোটরসাইকেলের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দেয়। এতে স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ে। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা (অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট) রয়েছে ১০টি। এসব কারখানায় জাপানের হোন্ডা, সুজুকি ও ইয়ামাহা, ভারতের বাজাজ, টিভিএস ও হিরো এবং দেশীয় ব্র্যান্ড রানারের মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজন করা হয়।
লাতিন আমেরিকায় রপ্তানিতে নতুন মাইলফলক
রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড। গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো মেক্সিকোতে মোটরসাইকেলের চালান রপ্তানি করেছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মোটরসাইকেল বাজারে প্রবেশ ঘটে বাংলাদেশের।
মুন্সীগঞ্জের আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত হোন্ডার কারখানায় তৈরি ৩২টি হোন্ডা এক্সব্লেড মোটরসাইকেলের একটি চালান মেক্সিকোতে পাঠানো হয়। এর আগে একই মডেলের মোটরসাইকেল গুয়াতেমালাতেও রপ্তানি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমাদের অগ্রাধিকার হলো দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ করা। বাংলাদেশে আরও সাশ্রয়ী মূল্যের মোটরসাইকেল সরবরাহ করার জন্য আমরা আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা ও স্থানীয়করণ বৃদ্ধি করছি। একইসাথে একটি সাশ্রয়ী উৎপাদন পরিকাঠামোও গড়ে তুলছি।'
উন্নত দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'হোন্ডার প্রযুক্তি হস্তান্তর, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বজুড়ে উপস্থিতির সুবাদে আমরা ইতোমধ্যে গুয়াতেমালা ও মেক্সিকোতে রপ্তানি করেছি এবং এখন মেক্সিকোতে রপ্তানি অব্যাহত রাখছি।'
শুধু হোন্ডাই নয়, দেশীয় প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলসও নেপাল ও ভুটানসহ আঞ্চলিক বাজারে মোটরসাইকেল রপ্তানি শুরু করেছে। এতে বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানির পথে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
রপ্তানিতে অগ্রগতি সত্ত্বেও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এখনও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার ঘাটতি রয়েছে।
তাদের মতে, একটি মোটরসাইকেল তৈরিতে ৭০০টিরও বেশি যন্ত্রাংশ লাগে। অথচ দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে বর্তমানে মাত্র চারটি প্রধান যন্ত্রাংশ চেইন ড্রাইভ, সিট, স্ট্যান্ড ও ব্যাটারি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়।
ফলে অধিকাংশ যন্ত্রাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকিও বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদনকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের নীতিগত ও কর-সুবিধাও এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান বলেন, শুল্ক প্রক্রিয়া, বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং বন্দরের বিলম্বের কারণে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এসব পরিস্থিতিতে ভারতীয় নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি আরও বলেন, কর-সুবিধা, সহজ ব্যাংকঋণ এবং শক্তিশালী নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ভারত তাদের মোটরসাইকেল শিল্প গড়ে তুলেছে। দেশটিতে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প থাকায় অধিকাংশ যন্ত্রাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। ফলে বন্দর বা ডেমারেজ ব্যয় বহন করতে হয় না। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতিগত সহায়তা না থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশ মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং রানার অটোমোবাইলসের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান বলেন, নতুন সরকারের উচিত মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ ও উপাদান স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। একই সঙ্গে যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে কর ও ভ্যাটে প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
