ডিপি ওয়ার্ল্ডের এনসিটি প্রস্তাব বাংলাদেশ-আমিরাত বৃহত্তর অংশীদারত্বের অংশ: সিপিএ চেয়ারম্যান
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবটি মূলত বাংলাদেশ ও ইউএই-এর মধ্যকার বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারত্বের অংশ। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব দীর্ঘায়িত হলে তা দুই দেশের সরকারের মধ্যে হওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান।
আজ বুধবার (১ জুলাই) বন্দরের নতুন ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার উদ্বোধনের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, ২০১৯ সালে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) উদ্যোগের আওতায় এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তাই এটিকে কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রস্তাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড সম্পূর্ণভাবে আরব আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে উপসাগরীয় এই দেশটিতে প্রায় ২৬ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন, যারা প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৪৬৫ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। এই বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কথা বিবেচনা করেই উদ্যোগটি সরকারি পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
সিপিএ চেয়ারম্যানের মতে, এই প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ইউএই-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে, যা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের অধীন রূপরেখায় তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক শাখা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এই প্রকল্পের ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার (লেনদেন উপদেষ্টা) হিসেবে কাজ করছে এবং প্রক্রিয়াটিকে এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষই সম্পদ বিনিয়োগ করছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান স্বীকার করেন যে, বিগত বছরগুলোতে এই প্রস্তাবটি বারবার নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে— তা দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিচালনগত (অপারেশনাল) দিক থেকেও এই প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, পুরনো যন্ত্রপাতিগুলো বন্দরের কার্যক্ষমতা নষ্ট করার আগেই এনসিটির আধুনিকায়নের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন।
তাঁর মতে, টার্মিনালের ক্রেন এবং কার্গো-হ্যান্ডলিং (পণ্য খালাস) যন্ত্রপাতিগুলো পুরনো হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এগুলোর প্রাপ্যতা বা কার্যক্ষমতা প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ৯৩ শতাংশের বেশি বৈশ্বিক মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
তিনি বলেন, কেবল বন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করতে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে এবং এতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে, ডিপি ওয়ার্ল্ড দ্রুত বিনিয়োগের বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে মাত্র এক বছরের মধ্যেই এই আধুনিকায়নের কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
মনিরুজ্জামান জানান, চলতি বছরের শুরুতে দুবাইতে বাংলাদেশ-ইউএই প্ল্যাটফর্মের এক বৈঠকে আলোচনার পর বর্তমানে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আলোচনার সময় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের 'সিপিএ স্কাই' প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়টিও তুলে ধরেন। এই প্ল্যাটফর্মটি স্বচ্ছতা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে বন্দরের ভূমির রেকর্ড এবং অপারেশনাল ডেটাকে একীভূত করে।
তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের ফলে অনলাইন টিকিটিংয়ের মাধ্যমে ট্রাক প্রসেসিংয়ের সময় ১৫-২০ মিনিট থেকে কমে এক মিনিটেরও নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের কারণে আর্থিক লেনদেনের সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে মাত্র কয়েক মিনিটে নেমে এসেছে।
মনিরুজ্জামান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক ম্যানুফ্যাকচারিং ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক খরচ কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। দেশের বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রতিযোগিতামূলক বন্দর অপরিহার্য।
