বিগত ১০–১৫ বছরের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘ঐতিহাসিক উন্নতি’ হয়েছে: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গত ১০–১৫ বছরের তুলনায়; বিশেষ করে ২০২৫ সালের চেয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির 'ঐতিহাসিক উন্নতি' হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, 'গত পরশু আমি সংসদে খাতভিত্তিক অপরাধের পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অধিকাংশ সূচকে আমরা ঐতিহাসিকভাবে উন্নত অবস্থানে আছি।'
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত দায়যুক্ত ব্যয় ব্যতীত অন্যান্য ব্যয় সম্পর্কিত মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় মন্ত্রী এসব কথা বলেন। পরে মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকার বরাদ্দ কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিরোধী সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'অধিকাংশ অপরাধের সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে, যদিও ধর্ষণ মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।'
এর কারণ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আগে ধর্ষিতারা মামলা রেকর্ড করতে থানায় যেত না, বা সামাজিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে পারতো না। এখন থানায় গেলেই বা অনলাইনে তারা জিডিসহ এফআইআর দায়ের করতে পারে। এখানে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই । যার ফলে সংখ্যাটা বৃদ্ধি পেয়েছে।'
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতের বিষয়েও সরকারের অগ্রগতি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, 'রামিসা হত্যা মামলার বিচার ১৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি রেকর্ড।'
এছাড়া দীর্ঘদিন অমীমাংসিত তনু হত্যা মামলায় ডিএনএ রিপোর্টের ভিত্তিতে আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, 'দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পুলিশ কোন গ্রেপ্তার করছে না। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়কে আমরা প্রাধান্য দেব না।'
তিনি বলেন, 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে ডগ স্কোয়াড, আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জাম যুক্ত করা হবে।'
মন্ত্রী বলেন, 'মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রেই সশস্ত্র থাকে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আধুনিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক জুয়া ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ১৮৬৭ সালের পুরোনো আইন বাদ দিয়ে আধুনিক জুয়া প্রতিরোধ আইন আনার উদ্যোগও চলছে।'
এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেটে ছাঁটাই প্রস্তাব করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
দেশে ক্রমবর্ধমান হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও নারী-শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, 'মার্চ ও এপ্রিল মাসে সারাদেশে হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয় ৬০৫টি। একই সময়ে ২৯৪ টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬ টি অপহরণ, ২২১৪টি চুরির ঘটনা এবং ১২৯টি পুলিশের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে । নারী ও শিশু নির্যাতন এ দুই মাসে নথিভুক্ত করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৬টি।'
জাতীয় দৈনিকের সংবাদের উদ্ধৃতি টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, 'সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটছে।'
তিনি বলেন, 'এই যখন আমাদের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার অবস্থা, তখন আমরা এই মন্ত্রণালয়ের জন্য দাবি তুলছি ৩১ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। পুরো বাজেটের সবটাই যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া হয় বা এই মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়; তারপরেও এই মন্ত্রণালয়ের কতটুকু উন্নয়ন হবে, আমরা জানি না।'
রুমিন ফারহানা বলেন, 'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বক্তব্য দেন, সারাদেশ মুগ্ধ হয়ে শোনে। আমিও ওনার ডিবেট মুগ্ধ হয়ে শুনি । কিন্তু ওনার এই মুগ্ধতা যদি উনি ওনার মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে দিতে পারতেন, তাহলে আর বাজেট ছাঁটাই করে এক টাকা করার প্রস্তাব আমি রাখতাম না।'
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'রুমিন ফারহানা মুগ্ধ হয়ে আমার বক্তব্য শোনেন জেনে আমি কৃতার্থ হলাম। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে উন্নত হয়েছে সেটার পরিসংখ্যানসহ খাতওয়ারী বর্ণনা গত পরশু সংসদে দিয়েছিলাম; সম্ভবত আমার ওই মুগ্ধকর বক্তব্যটা আপনি (রুমিন ফারহানা) সেদিন শুনতে পারেননি।'
আলোচনা শেষে বিরোধীদলীয় সদস্যদের ছাঁটাই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ অনুমোদন পায়।
