জামায়াত একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, ইশতেহারেও ইসলাম নেই: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা থেকে শুরু করে বর্তমান রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর 'সুবিধাবাদী অবস্থানের' তীব্র সমালোচনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের ৯৩ পৃষ্ঠার নির্বাচনী ইশতেহার সংসদে তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'মুখে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বললেও সেখানে শরিয়াহ আইন, ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী সমাজব্যবস্থা কিংবা ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার কোনো অঙ্গীকার নেই।'
তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'তাহলে জামায়াত আসলে কেমন ইসলামী দল?'
বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমেদ জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনা ট্রাস্টের শেয়ার বিক্রি নিয়ে চলমান বিতর্কেরও জবাব দেন।
জামায়াতকে একটি 'আন্তর্জাতিক সংগঠনের শাখা' হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'দলটির নামের সঙ্গে ইসলাম থাকলেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ইসলামী রাষ্ট্র বা শরিয়াভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।'
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতসংক্রান্ত দফার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'ইশতেহারে শুধু মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে, অথচ দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় অধ্যয়ন করে।'
দলটির অতীত ইতিহাস তুলে ধরে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, '১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে প্রতিষ্ঠিত জামায়াত ইসলামী ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষেও ছিল না, আবার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতারও বিরোধিতা করেছে।'
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গভর্নর এ এম মালেকের মন্ত্রিসভায় জামায়াত নেতাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, 'স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ পেয়ে দলটি পুনর্গঠিত হয় এবং পরে বিভিন্ন সময় সুবিধাবাদী রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হয়।'
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, দেশে পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, বরং আগের তুলনায় উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, 'এখন থানায় মামলা নিতে কোনো রাজনৈতিক নির্দেশ বা সুপারিশের প্রয়োজন হয় না।'
সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে, চার্জশিট দিয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে। সমাজে অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।' এছাড়া, মাদক ও জুয়া দমনে আধুনিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সালাহউদিন আহমদ।
৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়েই প্রণয়ন করা হয়েছে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ঋণনির্ভর বাজেটের সমালোচনা নাকচ করে তিনি বলেন, 'বিশ্বের প্রায় সব দেশই উন্নয়ন কার্যক্রমে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করে। সরকার রাজস্ব ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে।'
একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এছাড়া, সংসদে ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনা ট্রাস্টের শেয়ার বিক্রি নিয়ে ওঠা বিতর্কেরও কড়া জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা 'রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ হিসেবে ছাড় করা হয়েছে' বলে তিনি আগেও যে দাবি করেছিলেন, অডিট প্রতিবেদনে তার সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের বিপুল পরিমাণ শেয়ার নামমাত্র মূল্যে বিক্রির দালিলিক প্রমাণও তার কাছে রয়েছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
