বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন
দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশে পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন।
আজ সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন মুস্তাফা মনোয়ার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। কয়েকদিন আগে তার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেয়া হয়। কিন্তু আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় ভেন্টিলেটরে নেয়া হয়।
এর আগে তার স্ত্রী মেরী মনোয়ার জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে।
তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে। দীর্ঘ কর্মজীবনে চিত্রকলা, টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণসহ দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।
শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি। ছবি আঁকার কারণে কারাবরণও করতে হয়েছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের নকশার অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি। তার সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র 'পারুল' যেমন দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিশুতোষ চরিত্র 'মীনা'র সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।
শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও মানসম্মত টেলিভিশন অনুষ্ঠান 'নতুন কুঁড়ি' নির্মাণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। তার নির্মিত 'মনের কথা' অনুষ্ঠানও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত ও বিষণ্ন মুখ তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাদের মুখে হাসি ফেরাতে সেখানেই জীবনের প্রথম পাপেট শোর আয়োজন করেন তিনি। স্বাধীনতার পর সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে পাপেটকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার এই অসামান্য কীর্তি এ দেশে পাপেটশিল্পের বিকাশে নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
