নতুন ব্যবসা শুরুর সময় ৩৫৫ দিন থেকে ১৪ দিনে নামানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী
একটি প্রতিষ্ঠানের নতুন ব্যবসা শুরুর জন্য লাইসেন্স নেওয়ার সময়সীমা ৩৫৫ দিন থেকে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
তিনি বলেছেন, বর্তমানে একটি কোম্পানি নিবন্ধন থেকে ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, ক্লিয়ারেন্স ও অনুমোদন পেতে গড়ে ৩৫৫ দিন লাগে। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ প্রক্রিয়া আমূল সংস্কার করা হচ্ছে। এর ফলে নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার পর্যায়ে যেতে সর্বোচ্চ ১৪ দিন লাগবে। যেসব অনুমোদনের জন্য সরেজমিন পরিদর্শন প্রয়োজন হবে, সেগুলোও একটি সমন্বিত সংস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।
একই সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স, আইআরসি, ইআরসি-সহ বিভিন্ন অনুমোদন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আনা এবং ব্যবসা শুরু করার পুরো প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
আজ রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশে-বিদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার একটি অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে। তিনি আরও জানান, আগামীতে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে যেতে হবে না। একটি জাতীয় অনলাইন পোর্টালে আবেদন, ফি পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেই ডিজিটালভাবে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের অংশের অর্থও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের কাছে পৌঁছে যাবে। একই সঙ্গে আরজেএসসি, শেয়ার হস্তান্তর, লিকুইডেশন প্রক্রিয়াসহ ব্যবসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে 'স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি'। অতীতের মতো বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবর্তে এবার মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১১.৩ শতাংশ বরাদ্দ থাকলেও এবার তা বেড়ে ১৩.১ শতাংশ হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৪.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬.৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ৩১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮.৬৬ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৫.১ শতাংশ থেকে ১.৮৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যয়ের দক্ষতা ও বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এজন্য বছরে সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়িয়ে ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও (আইসিওআর) কমাতে হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৪১ থেকে ৪২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ব্যয় ও লজিস্টিক ব্যয় কমানোই সরকারের প্রধান কৌশল। বর্তমানে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মান প্রায় ১০ শতাংশ। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স দ্রুত করা এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী অদৃশ্য ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সংকটকে বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতির কারণে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। দ্রুত একটি নতুন এফএসআরইউ যুক্ত করে অতিরিক্ত ৫৫০ থেকে ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সার কারখানাগুলোর জন্য পৃথক এলএনজি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে চামড়া ও পাট খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সাভারের ট্যানারিগুলোকে আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজির গোল্ড সনদ অর্জনে সহায়তা দিয়ে চামড়া রপ্তানিকে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের সহযোগিতায় পাট গবেষণা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
