ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরও ৪৫ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন: ৩ ব্যাংকের সাথে চুক্তি
দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক গতিশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আরও ৪৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এসএমই ফাউন্ডেশনের রিভলভিং তহবিল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় এই ঋণ বিতরণ করা হবে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে দেশের ৩টি ব্যাংকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ফাউন্ডেশন। ব্যাংকগুলো হলো—মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং কর্মসংস্থান ব্যাংক।
চুক্তি অনুযায়ী, অর্থ বিভাগের নতুন পরামর্শ মোতাবেক সাধারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই ঋণের সুদের হার হবে মাত্র ৮ শতাংশ। তবে বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বাংলাদেশের সহায়তায় কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের সুদের হার হবে মাত্র ৭ শতাংশ। একজন উদ্যোক্তা সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। তবে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তারা ৯ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, 'আজ আমরা এমন এক উদ্যোগের সূচনা করছি, যার মাধ্যমে রেমিট্যান্সকে উদ্যোক্তায়, উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে এবং বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরের একটি টেকসই ভিত্তি নির্মাণ করা হবে। শিল্প মন্ত্রণালয় এসএমই ফাউন্ডেশনকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক এবং গতিশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা চাই, দেশের প্রতিটি সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা, সে নারী হোক, যুবক হোক, প্রত্যাগত অভিবাসী হোক কিংবা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের কোনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হোক, সকলেই যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা ও অর্থায়নের সুযোগ পায়।'
এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অংশীদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণের বিষয়ে উৎসাহিত করা হবে। বিশেষ করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে কোনো জামানত গ্রহণ করা হবে না। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা হবে সর্বোচ্চ ৪ বছর এবং ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ৪৮টি মাসিক কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করা যাবে।
মোট ঋণের ২৫ শতাংশ নারী-উদ্যোক্তাদের মাঝে এবং ২০ শতাংশ এসএমই ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া তহবিলের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ ১০ লাখ টাকা বা তার কম অংকের ঋণ হিসেবে এবং ৬০ শতাংশ উৎপাদন খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করতে হবে। অবশিষ্ট তহবিল সেবা ও ভ্যালু চেইন খাতে ব্যবহার করা যাবে।
ঋণ প্রাপ্তির অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাতসমূহ:
১. অগ্রাধিকারভুক্ত এসএমই সাব-সেক্টর, ক্লাস্টার এবং ভ্যালু চেইনের আওতাভুক্ত উদ্যোক্তা।
২. রপ্তানিযোগ্য পণ্য ও 'আমদানি-বিকল্প পণ্যের' উৎপাদনে নিয়োজিত উদ্যোক্তা।
৩. আইসিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল ব্যবসায় যুক্ত নতুন উদ্যোক্তা।
৪. সারা দেশের নারী-উদ্যোক্তা।
৫. পশ্চাদপদ অঞ্চল, উপজাতীয় অঞ্চল, প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা।
৬. জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল এবং সবুজ প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ।
৭. বিদেশ ফেরত অভিবাসী উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন ট্রেডবডি বা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সুপারিশকৃত উদ্যোক্তা।
তবে অনুৎপাদনশীল খাত যেমন—মুদি দোকান, ওষুধ বিক্রেতা, হার্ডওয়্যার বিক্রেতা এবং পরিবেশ দূষণকারী ব্যবসার অনুকূলে এই ঋণ প্রদান করা যাবে না। ফাউন্ডেশন নিয়মিতভাবে ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম মনিটরিং করবে এবং নিজস্ব লোকবল দ্বারা সরেজমিন পরিদর্শন করে ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৯ শতাংশই সিএমএসএমই। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই এই খাতে এবং এখানে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ কর্মরত। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসএমই ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার উদ্যোক্তার মাঝে ১২৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধাভোগী প্রায় ২২ লাখ উদ্যোক্তার মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টিউনন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান, বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার। স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।
