কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার আরও ৫৪ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন
কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার আরও ৫৪ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। শনিবার দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে (টিজি-৩২১) তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
এর আগে শুক্রবার আরও ৩৭ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। এ নিয়ে দুই দিনে কম্বোডিয়া থেকে মোট ৯১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন। ফেরত আসা ব্যক্তিদের বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা এবং বাড়ি পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
ভুক্তভোগীরা জানান, বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালাল চক্রের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে তাদের চীনা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে হস্তান্তর করা হয়।
শনিবার ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী জানান, জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর তার ফ্লাইট হয়। দুই দিন মালয়েশিয়ায় ট্রানজিটে থাকার পর ৭ ডিসেম্বর তিনি কম্বোডিয়া বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরের বাইরে এলে রবিন শেখ নামে এক বাংলাদেশি তাকে রিসিভ করে নিজের বাসায় নিয়ে যান।
তিনি বলেন, কিছুদিন পর দালাল রবিন তাকে কাজ দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যান। ২৩ ডিসেম্বর কম্পিউটারের কাজের কথা বলে তাকে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজে দেওয়া হয়। পরদিন কাজে যোগ দিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সেটি একটি স্ক্যাম প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা আদায় করা হয়।
ওই ভুক্তভোগীর দাবি, তিনি কাজ করতে না চাইলে সেখানে থাকা চীনা বস তাকে বলেন, টাকা দিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে চলে যেতে হবে। কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, দালাল রবিন শেখ তাকে ২ হাজার ৮৫ ডলারে বিক্রি করে দিয়েছে। এই টাকা না দিলে তাকে কাজ করতে হবে।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, কম্বোডিয়ায় থাকা এক বাংলাদেশি দালাল দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছেন। সুপারশপে চাকরির কথা বলে তাকে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়। পাঁচ মাস কাজ করানো হলেও তাকে মাসে ৪০০ ডলার দেওয়া হতো। থাকা-খাওয়ার খরচ বাদ দিলে তার হাতে কিছুই থাকত না। পরে তিনি ও তার পরিবার চাপ দিলে অন্য কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে তাকে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, এসব কম্পাউন্ডে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চাপ দেওয়া হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
এর আগে শুক্রবার কম্বোডিয়া থেকে ৩৭ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। একইভাবে এ বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফেরেন।
তাদেরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। পরে ভয়াবহ নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরপর দুই দিনে ৯১ জন বাংলাদেশির দেশে ফেরা প্রমাণ করে, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যাম মানবপাচারের ভয়াবহ একটি ধরন। কম্পিউটার অপারেটর, কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে নিয়োগের প্রচার চালানো হয়।
তিনি আরও বলেন, এরপর ভুক্তভোগীদের সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করা হয়। এ কারণেই সরকার ও ব্র্যাকের পক্ষ থেকে একাধিকবার থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিদেশগামীসহ সবার এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
