বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের ‘প্রগতি স্কিম’-এ অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ: সর্বজনীন পেনশনে জোর দিচ্ছে সরকার
বেসরকারি খাতের কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তফসিলি ব্যাংকগুলোর সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের "প্রগতি স্কিম"-এ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বুধবার (৩ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ের অর্থ ভবনে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) প্রতি এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা অংশ নেন। সভায় সচিব ব্যাংকগুলোর এমডিদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রগতি স্কিমের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। তিনি বলেন, "দেশে বেসরকারি খাতে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ নিবন্ধিত শ্রমিক ও কর্মচারীর বড় একটি অংশ অবসর-পরবর্তী কোনো আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় নেই। সরকারি চাকরিজীবীরা সরকারি পেনশন সুবিধা পেলেও বেসরকারি খাতে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত।"
তিনি আরও বলেন, "২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার অধীনে 'প্রগতি স্কিম' বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই অবসর সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।" সভায় প্রগতি স্কিমকে আরও আকর্ষণীয় করতে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালু, নমিনিদের জন্য আজীবন পেনশন সুবিধা বিবেচনা এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির মতো প্রস্তাবনাগুলোও তুলে ধরা হয়।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের উপস্থাপনায় বলা হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এ বেসরকারি খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি পেনশন ফান্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম মূলত সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ।
সভায় জানানো হয়, প্রগতি স্কিমটি বিশেষভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান এই স্কিমে যুক্ত হলে মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ কর্মী এবং বাকি ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বহন করবে। স্কিমে মাসিক চাঁদা ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই স্কিমের আওতায় অবসরের পর গ্রাহক আজীবন মাসিক পেনশন পাবেন। এছাড়া চাঁদার ওপর আয়কর রেয়াত এবং প্রাপ্ত পেনশন আয়করমুক্ত থাকবে। গ্রাহকের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সঞ্চিত তহবিলের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে উত্তোলনের সুযোগ থাকবে এবং পুরো বিনিয়োগ রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় থাকবে।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মে পর্যন্ত সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিমে (প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাসী) মোট ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। এসব স্কিমে মোট জমার পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা এবং এ পর্যন্ত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে, যার মধ্যে ২৪টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে চাঁদা গ্রহণ ও প্রদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের প্রতিটি থেকে অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশনের কোনো না কোনো স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি শাখায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের জন্য 'পৃথক ডেস্ক' স্থাপন, প্রচারণামূলক ব্যানার প্রদর্শন এবং ব্যাংকের নিজস্ব বিপণন কার্যক্রমে পেনশন স্কিমকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সকল বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রগতি স্কিমে যুক্ত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বলা হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আয়েশা হকের সঞ্চালনায় সভায় অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
