নতুন বোর্ডরুম, পুরনো চর্চা: ব্যাংকের এমডিরা হটসিটে

দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশে ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের শীর্ষ স্বপ্নের পদ ছিল কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়া। কিন্তু দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে এই সর্বোচ্চ পদ এখন পরিণত হয়েছে এক অনিশ্চিত "হটসিটে"—যেখানে ঘনঘন পদত্যাগের ঘটনা দিচ্ছে গভর্ন্যান্সে গভীর সংকটের ইঙ্গিত।
সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই ব্যাংক খাতের ওপর নজরদারি বেড়েছে বহুগুণ। আর্থিক অনিয়ম রোধে কঠোর হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইতিমধ্যেই এক ডজনের বেশি ব্যাংকের বোর্ডে পুনর্গঠনের মাধ্যমে রদবদল ঘটেছে, যার ফলে সরাসরি চাপে পড়েছেন শীর্ষ নির্বাহীরা।
এরইমধ্যে দেখা যাচ্ছে এক প্রবণতা; গত তিন মাসেই পাঁচটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি পদত্যাগ করেছেন, কাগজে-কলমে "ব্যক্তিগত কারণ" দেখিয়ে। তবে ভেতরের খবর বলছে—নতুন নিয়োগকৃত বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্বই মূল কারণ।
একটি আলোচিত ঘটনায় একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার, যাকে সফলভাবে একটি ব্যাংককে রূপান্তরের কৃতিত্ব দেওয়া হয়, নতুন বোর্ড সদস্যের হস্তক্ষেপ সহ্য করতে না পেরে আগেভাগেই পদত্যাগে বাধ্য হন।
বেশ কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ইতোমধ্যে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাকি যারা নিজ পদ আগলে রয়েছেন, তারাও রয়েছেন ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে।
এই পদত্যাগের জোয়ার আসলে আরও বড় একটি প্রবণতার অংশ। গত বছরের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ১৪টির এমডি পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে কাউকে আগের সরকারের সময়কার অনিয়মের তদন্ত শুরুর পর সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কেউবা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। আবার কয়েকজন দেশ ছেড়েছেন, কেউবা জড়িত থাকার অভিযোগে কারাগারেও গেছেন।
বর্তমানে অন্তত ১০টি ব্যাংক "কারেন্ট চার্জ" ভিত্তিতে এমডি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আরও দুটি ব্যাংকের এমডির চেয়ার শূন্য হতে যাচ্ছে শিগগিরই। সর্বশেষ সাউথইস্ট ব্যাংকের নুরুদ্দিন মো. সাদেক হোসেন এবং মেঘনা ব্যাংকের কাজী আহসান খলিল পদত্যাগ করেছেন।
খলিল তিন বছরের চুক্তিতে এমডি হয়েছিলেন, কিন্তু মাত্র ১৫ মাসের মাথায় তাকে সরে যেতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়াই তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। তিনি বলেন, "নতুন বোর্ড হঠাৎ করেই আমাকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিল। আমি তখন পদত্যাগ করলাম। বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করলে অনেক কিছুই বের হবে।"
চলতি বছরের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক মেঘনা ব্যাংকের বোর্ড বা পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে স্বাধীন পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার পরিচালক নিয়োগ করে। এর মধ্যে দুজনই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা।
এ অস্থিরতা ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ (রুমি) আলী এই প্রবণতাকে "অস্বাস্থ্যকর" আখ্যা দিয়ে বলেছেন, চলে যাওয়া অনেক এমডিই ছিলেন দক্ষ পেশাজীবী, যারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ যাচাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়েই এসেছিলেন।
তিনি বলেন, "কেন্দ্রীয় ব্যাংককে খুঁজে বের করতে হবে কেন এভাবে পদত্যাগ হচ্ছে," যিনি আইসিসি বাংলাদেশের কমিশন অন ব্যাংকিং-এরও চেয়ারম্যান। তিনি সতর্ক করেন, এতগুলো ব্যাংক অন্তর্বর্তী এমডির হাতে চলতে থাকলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মুহাম্মদ এ (রুমি) আলী আইসিসি বাংলাদেশের ব্যাংকিং কমিশনেরও চেয়ারম্যান।
এমডির সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের দ্বন্দ্ব কেন
সংকটের মূল কারণ লুকিয়ে আছে বদল না হওয়া বোর্ডরুম চর্চায়। পর্ষদ পাল্টালেও নতুন এমডিরা তাদের পূর্বসূরীদের মতোই রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন।
বোর্ড সদস্যরা এখনও রাজনৈতিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফে চাপ দিচ্ছেন। এমডিরা এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
একজন ব্যাংকার জানান, রাজনৈতিকভাবে একটি প্রভাবশালী কোম্পানি ৩১ কোটি টাকার ঋণ ১০টি ব্যাংকের মধ্যে পুনঃতফসিল চেয়েছিল। পাশাপাশি সুদের পুরোপুরি মওকুফ ও আসলের একাংশ ছাড়ের দাবি তুলেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল কমিটি 'নমনীয়তার সাথে' বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়, যা মানতে রাজী না হওয়া নির্বাহীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করে।
একজন এমডি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বোর্ড সদস্যরা এখনও নিজেদের ব্যাংকের মালিক ভেবে আচরণ করেন, অথচ ৯০ শতাংশ অর্থই আসে আমানতকারীদের কাছ থেকে।"
ব্যাংকাররা আরও জানান, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার প্রস্তাব বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) জোরালোভাবে বিরোধিতা করছে।
@সরকার বদলেছে, রয়ে গেছে হয়রানি
ব্যাংক নির্বাহীরা অভিযোগ করেছেন, নির্বিচার অপসারণের কারণে তাদের ক্যারিয়ার বিপর্যস্ত হচ্ছে। বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি ব্যাংকের এমডিকে গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়—অভিযোগের কোনো প্রমাণ ছাড়াই।
উক্ত ব্যাংকার জানান, দেরিতে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কারণে তিনি এক বছরেরও বেশি সময় কর্মহীন হয়ে পড়েন। "আমার বিরুদ্ধে কোনও অফেন্স ছিল না, তবু আমাকে চাপের মুখে সাইডলাইন করা হলো। না ব্যাংক, না কেন্দ্রীয় ব্যাংক—কেউই কোনও অভিযোগ আনেনি। এলোমেলোভাবে অপসারণের ফলে বড় ব্যাংকগুলো এখন দক্ষ নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ছে।"
হুইসেলব্লোয়াররা সুরক্ষাহীন
বাংলাদেশ ব্যাংক তার হুইসেলব্লোয়ার নীতির আলোকে, এমডিদের অনিয়মের চাপের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু নির্বাহীরা বলছেন, অভিযোগকারীর গোপনীয়তা কখনোই রক্ষা করা হয় না।
এক ব্যাংকার জানান, তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কিছু তথ্য দেন যা পরে ফাঁস হয়ে যায়, ফলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। আরেকটি ব্যাংকে রাজনৈতিক চাপে ঋণ অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করায় তার চুক্তি নবায়ন করা হয়নি।
অন্য একজন এমডি বলেন, "হুইসেলব্লোয়ারদের প্রকৃত কোনো সুরক্ষা নেই। একই বোর্ডরুম চর্চা; শুধু নতুন চেহারার আগমন। এমনকি কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাহীদের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বাধীন ও গোপন হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা ইউনিট প্রতিষ্ঠা জরুরি।
টিবিএসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আইনজীবী ও অধিকারকর্মী কল্লোল কিবরিয়া বলেন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১ – যেটি হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা আইন নামেও পরিচিত – এর বাস্তব প্রয়োগে বড় ঘাটতি রয়েছে। হুইসেলব্লোয়ারদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নেই এবং প্রয়োগও দুর্বল।
তিনি প্রস্তাব করেন, এ আইনকে আরও কার্যকরী করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বাধীন হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা দপ্তর গঠন করা উচিত।