তীব্র ইঞ্জিন সংকটে বিলম্বে ছাড়ছে ট্রেন, নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিয়ে শঙ্কা
তীব্র লোকোমোটিভ সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রেনের সময়সূচি ব্যাহত হওয়ায় আসন্ন ঈদুল আজহায় বাংলাদেশ রেলওয়ে ঘরমুখো যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে পারবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে গত রোববার (২৪ মে), ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিনে। সেদিন ময়মনসিংহগামী বিজয় এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে যায়। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ট্রেনটির ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছাড়ে সকাল ১১টা ৫ মিনিটে। আজ (২৫ মে) বিলম্ব কিছুটা কমে প্রায় এক ঘণ্টায় নেমে এসেছে।
ময়মনসিংহ ও জামালপুরগামী যাত্রীদের কাছে সড়কপথের তুলনায় ট্রেন ভ্রমণ সহজ ও সাশ্রয়ী হিসেবে বিবেচিত। তবে বারবার ট্রেন বিলম্ব হওয়ায় অনেক যাত্রীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
সংকট শুধু বিজয় এক্সপ্রেসে সীমাবদ্ধ নয়। গত ৩০ এপ্রিল কমলাপুর রেলস্টেশনে কিশোরগঞ্জগামী একটি ট্রেনের ইঞ্জিন না পৌঁছানোয় প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। এতে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা স্টেশনে বিক্ষোভ করেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম) পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রায় দুই হাজার ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে। এর মধ্যে ৮৫০টি ছিল আন্তঃনগর ট্রেন, প্রায় ৮০০টি মেইল ও এক্সপ্রেস সার্ভিস এবং ৩৫০টি লোকাল ট্রেন।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বিজয় এক্সপ্রেস একবার বিলম্বে চললে তার প্রভাব পুরো সপ্তাহজুড়ে থাকে। ছুটির দিনেও সেটিকে নির্ধারিত সময়ে ফিরিয়ে আনা যায় না। কারণ একটি ইঞ্জিন ও একটি রেকই চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ গিয়ে আবার ফিরে আসে। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় খুব কম থাকে। ইঞ্জিন সংকটের কারণেই শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। এছাড়া পুরোনো হওয়ায় অনেক সময় ইঞ্জিন মাঝপথে বিকল হয়ে যায়।"
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যমতে, সংস্থাটির ইঞ্জিন সংকট সবচেয়ে বেশি পূর্বাঞ্চলে। বর্তমানে এ অঞ্চলে ১৬৪টি ট্রেন বা ৮২ জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৯ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন, ৬০টি কমিউটার ও মেইল ট্রেন, ৮টি কনটেইনার ট্রেন এবং ৩৮টি লোকাল ও মিক্সড ট্রেন, যার মধ্যে ১৮টি শাটল ট্রেন।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের সব ট্রেন চালাতে প্রয়োজন ১১৯টি ইঞ্জিন। বর্তমানে কিছু পণ্যবাহী ও লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা ট্রেনগুলো পরিচালনার জন্য অন্তত ৮৮টি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সচল রয়েছে প্রায় ৮০টি। যদিও কাগজে-কলমে ইঞ্জিনের সংখ্যা ১২৯টি। বাকিগুলো মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে রেলওয়ের উন্নয়নে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে গত এক দশকে বহরে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৮০০টি কোচ এবং মাত্র ৩০টি লোকোমোটিভ। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই কেনা ভারী এসব ইঞ্জিন পুরোনো রেলসেতুতে চলাচল করতে পারে না। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
নতুন করে আরও ৩০০টি ইঞ্জিন আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।
গত রোববার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দভাগ স্টেশনে বিকল হয়ে পড়ে। প্রায় ৪০ মিনিট বন্ধ থাকার পর একই ইঞ্জিন মেরামত করে ট্রেনটি চট্টগ্রামে আনা হয়।
এর আগে গত ১ মে বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সোনার বাংলা এক্সপ্রেস আখাউড়া অতিক্রম করার পর ইঞ্জিন ত্রুটির কারণে রাত ৮টার দিকে থেমে যায়। পরে আরেকটি ইঞ্জিন এনে ট্রেনটি চালু করতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে ট্রেনটি রাত ৯টা ৫৫ মিনিটের পরিবর্তে কমলাপুর পৌঁছায় রাত সাড়ে ১২টায়।
পুরোনো ইঞ্জিনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পথে পথে ট্রেন বিকল হয়ে পড়ছে। এতে যাত্রার সময় বাড়ছে এবং পরবর্তী শিডিউলেও প্রভাব পড়ছে।
রেলওয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে পূর্বাঞ্চলে ১০১ বার ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে, যখন ঈদুল ফিতরের যাত্রা চলছিল, তখনই ইঞ্জিন বিকল হয়েছে ২৭ বার। আর ঈদযাত্রার ১৬ দিনে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে ১৪ বার, যার মধ্যে ৮টিই ছিল আন্তঃনগর ট্রেন। বাকিগুলো ছিল মেইল এক্সপ্রেস ও পণ্যবাহী ট্রেন।
কর্মকর্তাদের মতে, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় বিদ্যমান ইঞ্জিনগুলো প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পাচ্ছে না। ফলে সেগুলো বারবার বিকল হচ্ছে। এছাড়া বেশিরভাগ ইঞ্জিনের আয়ুষ্কালও শেষ হয়ে গেছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং জনবলেরও সংকট রয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সফিকুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "প্রয়োজনের তুলনায় কম ইঞ্জিন, কোচ ও রেক দিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু দূরপাল্লার ট্রেনে বিলম্ব হচ্ছে, তবে এর চেয়ে বিলম্ব কমানো সম্ভব নয়।"
তিনি বলেন, "ঈদযাত্রায় সর্বোচ্চ সেবা দিতে আমরা প্রস্তুত। কিন্তু মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে বিঘ্ন ঘটছে। এটি পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয়। তারপরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"
