ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন, ভাতা ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার
ঈদুল আজহার আগে শ্রমিকদের বেতন, ভাতা ও ঈদ বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, 'ঈদের আগেই শ্রমিকদের বেতন, ভাতা ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংক, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক সমন্বয় করা হয়েছে।'
আজ সোমবার (২৫ মে) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে সরকারের '১০০ দিন পূর্তি' উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং।
মাহদী আমিন বলেন, 'জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার গত ১০০ দিনে মানবিক ও জনমুখী রাজনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'দীর্ঘ দুঃশাসন, রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ১৬ বছরের ত্যাগ-সংগ্রামের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী ও জনবান্ধব নেতৃত্বে দেশ গভীর সংকট কাটিয়ে জনগণের ক্ষমতায়নের পথে এগিয়েছে।'
মাহদী আমিনের ভাষ্য, 'প্রথম ১০০ দিনেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার লুণ্ঠিত রাষ্ট্রীয় মালিকানা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃশ্যমান পদক্ষেপে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।'
তিনি বলেন, 'চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।'
মুখপাত্র বলেন, 'সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই অগ্রাধিকারভিত্তিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে বিষয়ভিত্তিক ও খাতভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।'
নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই 'ফ্যামিলি কার্ড' চালুর মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, 'ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই নেওয়া হয়। পাশাপাশি "কৃষক কার্ড" চালুর মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।'
মাহদী আমিন বলেন, 'দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
সরকার গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য 'সর্বোচ্চ স্বাধীনতা' নিশ্চিত করতে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'তবে বাকস্বাধীনতার নামে অপপ্রচার, বিদ্বেষ বা বিষোদ্গারের রাজনীতি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।'
মাহদী আমিন জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার মোট ১০টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকিগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ট্রেন ও বিশেষ নৌ-সার্ভিস চালুর কথাও জানান তিনি। মাহদী আমিন বলেন, 'নারীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে ট্রেনে আলাদা কম্পার্টমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া ঈদের সাত দিন আগে থেকে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'কোরবানির পশুর বর্জ্য ৮ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং সঠিক সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমানো সম্ভব হয়েছে।'
মাহদী আমিন বলেন, 'টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ইকোনমিক করিডোর বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের কাজ এগিয়ে চলছে।'
তিনি বলেন, 'বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা সম্প্রসারণ, বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু এবং তরুণদের জন্য 'স্পোর্টস' ও 'নতুন কুঁড়ি' কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।'
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, 'হামের টিকা এনে প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
সংবাদ সম্মেলনে শিশু রামিসার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী ভুক্তভোগী পরিবারের বাসায় গিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করা হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে এক আসামিকে ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি বিরল নজির।'
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক দিক তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, 'এখন ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান না, বরং প্রধানমন্ত্রীই জনগণের দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন। তিনি মানুষের কথা শুনছেন, দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং সাহস ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও "ইসরায়েল ব্যতীত" শব্দবন্ধ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।'
মাহদী আমিন জানান, 'এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'গত মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে। প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক রেমিট্যান্স প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি "প্রবাসী কার্ড" চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
মাহদী আমিন আরও বলেন, 'প্রায় ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী নিজেকে কোনো দূরবর্তী ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং গণমানুষের প্রতিনিধি ও সমাজের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করছেন।'
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মাহদী আমিন পবিত্র ঈদুল আজহার অগ্রিম শুভেচ্ছা জানান। পরে লিখিত বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি, মোস্তফা জুলফিকার হাসান, মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ), শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীনসহ প্রেস উইংয়ের অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
