চট্টগ্রামে পশুর হাটে পর্যাপ্ত সরবরাহ, ছুটি শুরু হওয়ায় জমে ওঠার আশা
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরের স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোরবানির পশুর ব্যাপক সরবরাহ দেখা যাচ্ছে। হাটগুলোতে পশুর পর্যাপ্ত মজুত এবং বিক্রেতাদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো হলেও এখন পর্যন্ত বেচাকেনায় কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে ব্যবসায়ী, ইজারাদার ও বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আজ সোমবার (২৫ মে) থেকে ঈদের আনুষ্ঠানিক সরকারি ছুটি শুরু হওয়ায় হাটগুলোতে ক্রেতাদের সমাগম এক ধাক্কায় অনেক বেড়েছে। এত দিন ক্রেতারা কেবল বাজার ঘুরে পশুর মান ও দাম যাচাই করলেও আজ বিকেল থেকে পুরোদমে বিক্রি শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেপারিরা বলছেন, সরকারি ছুটি ও চাকরিজীবীদের ঘরে ফেরার ওপরই মূলত বাজারের মূল বেচাকেনা নির্ভর করে। তাই শেষ মুহূর্তের কয়েক দিনে চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর বাজার পুরোপুরি জমে উঠবে। নগরের বড় বড় হাটগুলো ঘুরে দেখা গেছে—কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা ও নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত পশুর ট্রাক চট্টগ্রামে এসেছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় খামার এবং হাটহাজারী, পটিয়া, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর গৃহপালিত পশুর উপস্থিতিও এবারের হাটে বেশ নজর কাড়ছে।
সোমবার সকালে নগরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট বিবিরহাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দেশের নানা অঞ্চল থেকে আসা বেপারিরা পশুর পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ২২টি গরু নিয়ে এই হাটে এসেছেন বেপারি আব্দুস সালাম। তিনি জানান, বাজারে গরুর কোনো অভাব নেই এবং ক্রেতারা দলে দলে এসে গরু দেখছেন ও পছন্দ করছেন। কিন্তু চূড়ান্তভাবে কেনার জন্য যে দরদাম, তা ক্রেতারা এখনো সেভাবে শুরু করেননি। তার মতে, কোরবানিদাতাদের বেশিরভাগই ঈদের একদম আগে আগে গরু কিনে ঘরে ফেরা নিরাপদ মনে করছেন, যার কারণে বাজারে পশুর ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও বেচাকেনায় এই ধীরগতি। তবে আজ ছুটির দিন হওয়ায় বিকেল থেকে বাজার পুরোদমে জমে উঠবে বলে আশা করছেন তিনি।
একই হাটে জামালপুর থেকে ১৮টি মাঝারি ও বড় সাইজের গরু নিয়ে এসেছেন হযরত আলী। তিনি গত ৮ বছর ধরে নিয়মিত চট্টগ্রামের এই বিবিরহাট বাজারে কোরবানি উপলক্ষে গরু নিয়ে আসছেন। হযরত আলী জানান, এবার তার কাছে মাঝারি সাইজের ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা দামের বড় গরু রয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ১১টার দিকে তিনি বাজারে এসে পৌঁছালেও আজ সোমবার দুপুর পর্যন্ত তার একটি গরুও বিক্রি হয়নি। তবে দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি মোটেও হতাশ নন। তার আশা, আজ বিকেল বা সন্ধ্যা থেকে চাকরিজীবী ও সাধারণ ক্রেতারা হাটে আসা শুরু করলে বাজার পুরোদমে জমতে শুরু করবে।
অবশ্য হাটের এই ধীরগতির মধ্যেও অনেক ক্রেতা তাদের কাঙ্ক্ষিত বাজেটের মধ্যে পছন্দের পশু কিনে ঘরে ফিরছেন। বিবিরহাট বাজারে ঢোকার পথেই দেখা গেল অক্সিজেনের বাসিন্দা মো. আরিফকে, যিনি গরুর রশি হাতে বেশ উৎফুল্ল মনে বাজার থেকে বের হচ্ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি জানান, অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষ পর্যন্ত নিজের বাজেটের মধ্যে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনতে পেরেছেন এবং হাটের নিয়ম অনুযায়ী ৩ হাজার টাকা হাসিল পরিশোধ করেছেন।
বাজারের ইজারাদারের প্রতিনিধি সামির আহমেদ জানান, সোমবার ও মঙ্গলবার বিবিরহাটের মূল 'বাজার বার' বা প্রধান দিন হওয়ায় আজ সকাল থেকেই বাজারে পশুর চাপ ও ক্রেতার ভিড় দুটোই বেড়েছে। গত কয়েক দিনে কেবল উত্তরবঙ্গ থেকেই কয়েক হাজার গরু এই বাজারে প্রবেশ করেছে। বাজারের মূল সামিয়ানার ভেতরে প্রায় ১৫০০ গরু বাঁধার সুনির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, তবে সরবরাহ এত বেশি যে মূল সীমানা ছাড়িয়ে বিবিরহাট, সুন্নিয়া মাদ্রাসা রোড, বশর মার্কেট এলাকা এবং রেলবিট এলাকা পর্যন্ত কয়েক হাজার গরু লাইন ধরে রাখা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামের বৃহত্তম পশুর হাট সাগরিকা বাজারে শহরের অন্যান্য বাজারের তুলনায় তুলনামূলক বড় সাইজের এবং ভারী ওজনের গরু বেশি এসেছে। এই হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, গতকাল রোববারই এই বাজারে একটি বড় সাইজের গরু সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সাগরিকা হাটে বেশি গরু এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও মাগুরা এলাকা থেকে। এই হাটে গরুর পাশাপাশি ছাগল ও ভেড়ারও একটি বিশাল বাজার বসেছে, যেখানে ৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা মূল্যের ছাগল ও ভেড়া পাওয়া যাচ্ছে। নজরুল নামের এক বিক্রেতা দুটি বড় ভেড়ার দাম হেঁকেছেন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যার মধ্যে একটির দামই এককভাবে এক লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে।
শহরের কোরবানিদাতাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, নগরজীবনে আগেভাগে পশু কিনে রাখার ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা ও রাখার জায়গার তীব্র সংকট একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বহুতল ভবনের নিচে বা গ্যারেজে দীর্ঘদিন গরু রাখা কষ্টকর। নগরীর বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, "গরু রাখা ও দেখভালের ঝামেলা এড়াতে ঈদের ঠিক আগের দিন পশু কেনার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছি। এমনিতে বাজার ঘুরে দেখছি কী অবস্থা।"
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর জানিয়েছেন, কোরবানি উপলক্ষে এবার চট্টগ্রাম জেলার নগর ও উপজেলাজুড়ে মোট ২১২টি পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে নগরের ভেতরে রয়েছে ৩টি স্থায়ী এবং ৭টি অস্থায়ী পশুর হাট।
স্থায়ী হাটগুলো হলো—সাগরিকা পশুর বাজার, বিবিরহাট গরুর বাজার এবং পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার। এছাড়া অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে মধ্যম হালিশহর মুনির নগর আনন্দ বাজার সংলগ্ন রিং রোডের খালি জায়গা, কর্ণফুলী পশুর বাজার (নূর নগর হাউজিং এস্টেট), ৪০নং উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের মুসলিমাবাদ রোডের সিআইপি জসিমের খালি মাঠ, ৩৯নং দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের আউটার রিং রোডস্থ সিডিএ বালুর মাঠ, ৪০নং উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের পূর্ব হোসেন আহম্মদ পাড়া সাইলো রোডের পাশের টিএসপি মাঠ, ৪১নং ওয়ার্ডের আলমগীরের বালির মাঠ এবং ২৬নং ওয়ার্ডের উত্তর হালিশহর গলাচিপাপাড়া বারুনিঘাট মাঠেও ঈদের দিন পর্যন্ত পুরোদমে পশু কেনাবেচা চলবে।
