ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ফেডারেশনের মশাল মিছিল
সারাদেশে চলমান তীব্র নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মশাল মিছিল করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগর শাখা।
শুক্রবার (২২ মে) সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক মিছিল-পূর্ব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক আল-আমীন রহমানের সভাপতিত্বে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার।সাধারণ সম্পাদক সাকিবুর রহমান রনি, সহ-সভাপতি সীমা আক্তার, সহ-সাধারণ সম্পাদক হৃদিয়া আফরোজ রাকা, ঢাকা মহানগর শাখার সদস্য সচিব তুহিন ফরাজি ও নির্বাহী সদস্য ইয়াসির খান।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক বিবৃতির সমালোচনা করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ বলেন, 'দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার যে অবনতি, তা ঠেকাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেননি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সারাদেশে যখন ধর্ষণের বিচারের দাবিতে সভা-সমাবেশ চলছে, তখন অনেকে নানাভাবে এখানে শরীয়া আইন বাস্তবায়নের যে পায়তারা করছেন, সেই প্রেক্ষিতে অনেকে যখন নানাভাবে বলছেন প্রকাশ্যে হত্যা করতে হবে—তার প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন যে আমরা মধ্যযুগে বাস করছি না। তখন আমরা দেখতে পেলাম, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি বলেছেন যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধর্ম অবমাননা করেছেন।।আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশে এই একুশ শতকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ ও ভরসাযোগ্য বিচার ব্যবস্থা। জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কোনো মধ্যযুগীয় আইন বাস্তবায়নের পায়তারা আমরা মেনে নেব না।'
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক আল-আমীন রহমান বলেন, 'এখন পর্যন্ত ধর্ষণ বিষয়ে যত মামলা দায়ের হয়েছে, তার মাত্র ৩ শতাংশ মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে। তার মধ্যে ৭০ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রে আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছে। বাকি মামলাগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হেনস্তাকারী লাইব্রেরি স্টাফকে যখন পুলিশ গ্রেপ্তার করে, তখন উগ্রপন্থীরা ধর্মের লেবাসে তাকে ফুল ও কোরআন শরীফ দিয়ে ছাড়িয়ে আনে। এইসব বিচারহীনতার সংস্কৃতি ধর্ষকদের সাহস বাড়ায়।'
মশাল মিছিল চলাকালে পাশবিক ধর্ষণের পর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া শিশু রামিসার বাবার সেই আকুল ও ক্ষুব্ধ আর্তনাদ—'আমি বিচার চাই না, আপনাদের বিচার করার রেকর্ড নাই'—বক্তব্যটি মাইকে প্রচার করা হয়। এ প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, 'একজন ভাগ্যাহত পিতার এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে দেশের বিচার ব্যবস্থা আজ কতটা দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র যখন অপরাধীদের সুরক্ষা দেয়, তখন নাগরিকের আর আদালতের প্রতি আস্থা থাকে না।'
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া বলেন, '১ বছর আগে ঢাবির নারী শিক্ষার্থীরা রাতে হলের গেট ভেঙে বেরিয়ে এসে শিশু আছিয়ার ধর্ষণ পরবর্তী নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সেই মামলা এখন আপিল বিভাগে ঝুলছে। ঢাবির ১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী প্রার্থনা মজুমদারের মা রীতা মজুমদারকে নিজ বাড়িতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মাদ্রাসা ছাত্র আবদুল্লাহকে বলাৎকার করে হত্যা করা হয়। বর্তমানে দেশে সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। শিশু থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, কেউই আজ নিরাপদ নয়। একের পর এক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অপরাধ ঘটলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এই বিচারহীনতাই নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।'
বক্তারা অবিলম্বে শিশু রামিসাসহ সকল হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জবাবদিহিমূলক বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
সমাবেশ শেষে একটি মশাল মিছিল রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্ট প্রদক্ষিণ করে।
