জামায়াত ও আ.লীগপন্থীদের বর্জনের মধ্যেই শেষ হলো চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির ভোট গ্রহণ
নানা নাটকীয়তা, উত্তেজনা, বিক্ষোভ এবং প্রধান দুটি পক্ষের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচন।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল ৯টায় সমিতির মিলনায়তনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে চলে বিকেল ৪ পর্যন্ত।
তবে দেশের অন্যতম শীর্ষ এই আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে 'একতরফা ও প্রহসন' আখ্যা দিয়ে তা পুরোপুরি বর্জন করেছে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা। ভোটগ্রহণ চলাকালে আদালত পাড়ায় দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে এবং দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।
ভোটগ্রহণ শুরুর পরপরই সকাল থেকে ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় নির্বাচন বাতিলের দাবিতে মিছিল-বিক্ষোভ করতে থাকেন জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত আইনজীবীরা। তারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চরম পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। গতকালই আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত জানান তারা।
এদিকে আজ দুপুর ২টার দিকে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা 'সাধারণ আইনজীবী পরিষদ'-এর ব্যানারে আইনজীবী শাপলা ভবনের সামনে এক অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা 'ভোট চোর', 'প্রহসনের নির্বাচন মানি না মানব না' বলে স্লোগান দিতে থাকেন এবং আইনজীবী ভবনের আশপাশে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
মিছিলটি কোর্ট হিলের বাহির পথ হয়ে মসজিদের সামনে পৌঁছালে সেখানে অবস্থানরত বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তাদের লক্ষ্য করে 'ফ্যাসিস্ট ফ্যাসিস্ট' বলে পাল্টা স্লোগান দিতে শুরু করেন, যা আদালত চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি করে। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করতে ব্যাপক পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের মূল অভিযোগ, নির্বাচনের শুরু থেকেই তাদের কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ মে মনোনয়নপত্র বিতরণের নির্ধারিত দিনে বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মাত্র ২ ঘণ্টার রহস্যজনক সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তারা নির্দিষ্ট সময়ে লাইব্রেরি ভবনে ফরম নিতে গেলেও ভেতরে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা অবস্থান নিয়ে তাদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করেন। নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং হামলার আশঙ্কায় বিকেল ৫টা ১০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তারা ফরম সংগ্রহ করতে পারেননি। গত বছরও একইভাবে বাধা দিয়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল বলে তারা দাবি করেন।
এবারের নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ পদে একক প্রার্থী থাকায় কোনো ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি এবং তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ১২টি পদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। কারণ, এসব পদে মোট ২৪ জন প্রার্থী থাকলেও গতকাল জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের ১২ জন প্রার্থী একযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ফলে নির্বাচনি মাঠে শুধু বিএনপিপন্থী প্রার্থীরাই সক্রিয় ছিলেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি একতরফা রূপ নেয়।
জামায়াতপন্থী ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক শামসুল আলম জানান, একতরফা এই নির্বাচনের প্রতিবাদে সমিতি থেকে তাদের প্যানেলের সাতজন পদত্যাগ করেছেন এবং তালিকায় থাকা বাকি ১২ জন প্রার্থীও ভোট বর্জন করেছেন। সাধারণ ভোটাররাও ভোট দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়া উদ্দিন এই নির্বাচনকে সমিতি দখলের একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, গত নির্বাচনে যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন, তাকেই এবার পুরস্কার স্বরূপ সভাপতি প্রার্থী করা হয়েছে। বিএনপি তাদের সেই পুরনো মাগুরা স্টাইলের ভোট চুরির চরিত্রে ফিরে এসেছে। একই সাথে সাধারণ আইনজীবীদের কষ্টার্জিত অর্থে গড়া কল্যাণ তহবিলের অর্থ লুটপাট করার ষড়যন্ত্র চলছে। এই ফান্ডের এক পয়সাও কাউকে অপচয় করতে দেওয়া হবে না এবং সাধারণ আইনজীবীরা এই চক্রান্তের দাঁতভাঙা জবাব দেবে।'
আইনজীবীরা বলছেন, ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই সমিতিতে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে একতরফা আধিপত্য বজায় রাখার এই চেষ্টাকে পেশাজীবীদের জন্য অত্যন্ত 'লজ্জাজনক' এবং গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
