কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর পশুর হাটে ক্ষণগণনা শুরু
আর মাত্র কয়েক দিন পরই মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। ২৮ মে ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে এখন থেকেই দেখা মিলছে কোরবানির চেনা আমেজ।
কোথাও বাঁশের খুঁটি পুঁতে তৈরি হচ্ছে অস্থায়ী ঘেরা, কোথাও টাঙানো হচ্ছে বিশাল শামিয়ানা। একের পর এক ট্রাকভর্তি গরু এসে নামছে হাটে। জায়গা দখল, আগাম দর-কষাকষির হিসাব আর পশুর যত্নে ব্যস্ত সময় পার করছেন বেপারিরা।
গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট, শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের মাঠ, আমুলিয়া মডেল টাউনসহ ঢাকার দুই সিটির বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, পুরো হাট ধীরে ধীরে জমে উঠছে ঈদকে কেন্দ্র করে। এখনও পুরোদমে বেচাকেনা শুরু না হলেও প্রস্তুতির ব্যস্ততায় বোঝা যাচ্ছে, কোরবানির ঈদ আর খুব বেশি দূরে নয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব মাঠের হাটে দুপুরের রোদ উপেক্ষা করে শ্রমিকরা বাঁশ বেঁধে ঘেরা তৈরি করছিলেন। একটু দূরে ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছিল গরু। কেউ পশুকে পানি খাওয়াচ্ছেন, কেউ খড় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ গরুর গায়ে পানি ঢেলে গরম কমানোর চেষ্টা করছেন।
হাটে আসা বেপারিদের বড় চিন্তা এখন ভালো জায়গা নিশ্চিত করা। প্রবেশমুখ বা সামনের সারিতে জায়গা পেলে ক্রেতাদের নজর আগে পড়ে—এমন হিসাবেই চলছে নীরব প্রতিযোগিতা।
রাজশাহী থেকে আসা বেপারি শহিদুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আগে আসলে ভালো জায়গা পাওয়া যায়। তাই ঝামেলা এড়াতে আগেই চলে এসেছি। এখন পশুগুলোকে বিশ্রাম দিচ্ছি। ক্রেতা আসতে শুরু করলে তখন আর সময় পাওয়া যায় না।"
অনেক বেপারিকেই নিজেদের পশুকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে দেখা গেছে। কেউ শিংয়ে তেল মাখাচ্ছেন, কেউ গরুর গা ব্রাশ করছেন। হাটে ওঠার আগেই যেন শুরু হয়ে গেছে নীরব প্রতিযোগিতা।
হাট-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে রাজধানীর পশুর হাটগুলো পুরোপুরি জমে উঠবে। তখন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আরও হাজার হাজার পশু ঢাকায় আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার রাজধানীতে ২৪টিসহ সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২টি অস্থায়ী হাটের প্রস্তুতি চলছে। এর বাইরে রয়েছে গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট বসবে ১১টি স্থানে। এর মধ্যে রয়েছে পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পাড়সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের মাঠ, রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউন এবং শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকা।
এ ছাড়া শিকদার মেডিকেল–সংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গা, কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পানির পাম্পসংলগ্ন রাস্তার অব্যবহৃত অংশ, দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত খালি জায়গা, বনশ্রী হাউজিংয়ের মোস্তমাঝি মোড়সংলগ্ন এলাকা, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ এবং গোলাপবাগ আউটার স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশেও কোরবানির পশুর হাট বসবে।
অন্যদিকে গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবে ১২টি অস্থায়ী পশুর হাট। এসব হাটের মধ্যে রয়েছে খিলক্ষেত বাজারসংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গা, মিরপুর সেকশন-৬-এর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকা, মিরপুর কালশী বালুর মাঠ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসংলগ্ন এলাকা এবং মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজারসংলগ্ন খালি জায়গা।
এ ছাড়া পূর্ব হাজীপাড়া ইকরা মাদ্রাসার পাশের খালি জায়গা, মোহাম্মদপুর বছিলার ৪০ ফুট সড়কসংলগ্ন এলাকা, উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকা, ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে রানাভোলা অ্যাভিনিউসংলগ্ন স্লুইসগেট পর্যন্ত এলাকা, কাঁচকুড়া বাজারসংলগ্ন রহমান নগর আবাসিক এলাকা, মস্তুল চেকপোস্টসংলগ্ন পশ্চিমপাড়া এবং ভাটারা সুতিভোলা খালসংলগ্ন এলাকাতেও কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসবে।
দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এবার পাঁচ দিনব্যাপী এসব পশুর হাটে কেনাবেচা চলবে।
এদিকে সীমান্ত এলাকায় পশুর হাট বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশের বিভিন্ন হাটে কোরবানির পশু আসা শুরু হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, "এবার যত্রতত্র বা সড়কের ওপর কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। নিয়মের বাইরে কাউকে হাটের ইজারা দেওয়া হয়নি।"
তিনি আরও বলেন, "ক্রেতারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কিনতে পারেন, সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোরবানির বর্জ্য যাতে যত্রতত্র না ফেলা হয়, সেজন্য প্রতিটি হাটে বিশেষ ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে। হাট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে।"
