গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরাতে শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ও সাংবাদিক সুরক্ষার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
'বাংলাদেশ সাংবাদিকতা সম্মেলন ২০২৬'-এর একটি থিম্যাটিক সেশনে বিশেষজ্ঞরা এবং সংবাদমাধ্যম নেতারা সাংবাদিকতায় বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য আধুনিক নৈতিক মানদণ্ড এবং সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আজ শনিবার (৯ মে) রাজধানীর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে 'বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ: পেশাদার তদারকি, জবাবদিহিতা এবং অভিযোগ প্রতিকার' শীর্ষক এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া আইন বিশেষজ্ঞ ড. জোয়ান বারাতা বলেন, 'স্ব-নিয়ন্ত্রণ একটি নৈতিক দায়িত্ব যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে।'
তিনি বলেন, 'স্ব-নিয়ন্ত্রণ হলো নৈতিকতার বিষয়, এমনকি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতও বলেছে যে নৈতিক ও পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এটি রাষ্ট্রের ভূমিকা হতে পারে না।'
ডিজিটাল যুগের জন্য নৈতিক কাঠামোর আধুনিকীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, 'রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতির ক্ষেত্রে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়—সেসব বিষয়ে এখন নৈতিক আচরণবিধিতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।'
বারাতা গণমাধ্যমের মালিকানা একীভূতকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'গণমাধ্যমের বহুত্ববাদ রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম কেবল প্রতিযোগিতার ওপর নয়, জনমত গঠনের ওপরও প্রভাব ফেলছে কি না, তা যাচাই করার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকা উচিত।'
টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ সংকুচিত সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতায় নৈতিক মানদণ্ডের অবনতি সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, 'অল্প কিছু গণমাধ্যম অবশিষ্ট আছে এবং ধীরে ধীরে সেগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, কারণ চরিত্র হনন এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'যখন সংবাদপত্র বা আমাদের বিরুদ্ধে চরিত্র হনন করা হয়, তখন প্রায়শই সাংবাদিকরাই তাদের বিবেকের সীমা লঙ্ঘন করে এটি করেন।'
সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য চাকরির নিরাপত্তাকে অপরিহার্য উল্লেখ করে আজাদ বলেন, 'আমরা যদি কালো টাকার মালিকদের হাত থেকে গণমাধ্যমকে রক্ষা করতে চাই, তবে আগে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতে হবে।' তিনি আরও বলেন, 'চাকরি এবং বেতনের নিশ্চয়তা অবশ্যই থাকতে হবে—শুধু সংবাদপত্রেই নয়, প্রতিটি পেশাতেই।'
দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ সাংবাদিকতায় ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক দাসত্বের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, 'আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি। আমরা বসের অনুগত এবং রাজনীতির অনুগত হয়ে পড়ছি। সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে প্রতিটি রাজনৈতিক শাসন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিউজরুমের শাসনও পরিবর্তিত হয়।'
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের প্রস্তাব করেছি। নিউজরুমে কোনো অন্যায় হলে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।'
বিবিসি'র সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ারের সঞ্চালনায় এই সেশনে প্রথম আলো ওয়েবের আয়েশা কবিরসহ অন্যান্য বক্তারা বাংলাদেশের মিডিয়া খাতে জনআস্থা এবং পেশাদার সততা পুনর্গঠনের জন্য স্বচ্ছ নিউজরুম পরিচালনা, শক্তিশালী জবাবদিহিতা ব্যবস্থা এবং কার্যকর অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
