গণমাধ্যম খাতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে: তথ্যমন্ত্রী
স্বাধীন ও অংশগ্রহণমূলক গণমাধ্যম পরিচালনার সুবিধার্থে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
আজ রোববার (৩ মে) নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত 'বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬' আলোচনা সভায় এ কথা জানান তিনি।
তথ্যমন্ত্রী জানান, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল গণমাধ্যমকে একীভূত কাঠামোর আওতায় আনতে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, 'এ প্রক্রিয়ায় সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ কমিটি গঠন করা হবে।'
তিনি বলেন, 'ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দমনমূলক নয়, বরং সমাধানমুখী ও অংশগ্রহণমূলক নীতি কাঠামো প্রয়োজন।'
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, 'সরকার নিজেই একটি পক্ষ, তাই একে সবসময় অভিভাবক হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত নয়। অতীতেও সরকারের ভূমিকা বিতর্কিত হয়েছে। তাই এমন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দরকার, যা সরকারসহ সব পক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনবে।'
সভায় গণমাধ্যমের বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে সাংবাদিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, 'সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আত্মসমালোচনা জরুরি। সাংবাদিকতা কি সত্যিই জনস্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি তা গোষ্ঠী ও বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রভাবিত হচ্ছে তা বিবেচনা করা জরুরি। এআই যুগে দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।'
মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, 'দেশে অপতথ্য এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে। শুধু আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।'
দ্য নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, 'গণমাধ্যম দিবসটির মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র শক্তিশালী করা ও সাংবাদিকতার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া।' তিনি নতুন কমিশন গঠনের আগে আগের কমিশনের সুপারিশগুলো মূল্যায়নের আহ্বান জানান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বৈত অবস্থানকে গণমাধ্যম স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে পৃথক দুটি আলোচনা সভায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের কাঠামোগত সংস্কার, স্বাধীন কমিশন গঠন, অপতথ্য বিস্তার এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।
নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আলোচনা সভার পাশাপাশি আজ ধানমন্ডিতে ইউনেস্কো ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর যৌথ আয়োজনে 'জনআস্থা পুনর্গঠন: বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি' শীর্ষক আলোচনায় গণমাধ্যম স্বাধীনতা ও জনআস্থার সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।
টিআইবি-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'রাজনৈতিক ও শাসন কাঠামোর মধ্যে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। সেলফ-রেগুলেশন অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারেও পরিণত হতে পারে।'
ইউনেস্কো প্রতিনিধি সুসান ভাইজ বলেন, 'মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইউনেস্কোর মৌলিক নীতি হলেও বিশ্বজুড়ে এটি ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে।' স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করতে তিনি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে সহায়ক নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, 'বর্তমান সময়ে সরকারের প্রকাশ্যে সমালোচনা তুলনামূলকভাবে সম্ভব হচ্ছে, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে।'
সভায় জানানো হয়, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশ বর্তমানে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে, যা আগের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়েছে। বক্তারা এই পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন।
