কমে এসেছে চিংড়ির সরবরাহ: হিমায়িত খাবারে ভর করে টিকে থাকছে সামুদ্রিক খাবার রপ্তানিকারকেরা
চট্টগ্রামের সাগরিকা এলাকার একটি সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় স্বয়ংক্রিয় মেশিনে তৈরি হচ্ছে পরোটা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তা প্যাকেটবন্দি হয়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
কাজ চলছে নিঃশব্দে, দ্রুতলয়ে। তবে এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এক বৃহত্তর পালাবদল। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এখন হিমায়িত খাবারের (ফ্রোজেন ফুড) দিকেই ঝুঁকছে ধুঁকতে থাকা সামুদ্রিক খাবার শিল্প।
সিমার্ক গ্রুপ-এর এই কারখানা কিন্তু পরোটা তৈরির জন্য গড়ে ওঠেনি। এই খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মতোই, প্রায় তিন দশক আগে সামুদ্রিক মাছ রপ্তানির উদ্দেশ্যেই তাদের পথ চলা শুরু হয়েছিল।
কিন্তু কাঁচামাল, বিশেষত চিংড়ির সরবরাহ কমে আসায় ব্যবসা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কারখানা যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য সাবধানে তারা হিমায়িত খাবারের ব্যবসায় পা রাখছে।
খাদের কিনারে সামুদ্রিক খাবার শিল্প
একসময় বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত মাছ রপ্তানি হতো। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতি, পরিবেশের অবনতি ও বৈশ্বিক গতিমন্থরতার জেরে তা এখন ৪৫০ মিলিন ডলারে নেমে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসেব করলে পতনের এই ছবিটা আরও প্রকট। সিমার্কের রপ্তানি আয় ৪০-৬০ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে। এর মধ্যে হিমায়িত খাবার থেকে আসছে প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার। এই খাতটির পরিধি ক্রমশ বাড়লেও, তা আগের সামগ্রিক আয়ের তুলনায় অনেক কম।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতির জন্য একাধিক কারণ দায়ী। তারা বলেন, দূষণের জেরে মাছ গভীর সমুদ্রে চলে যাচ্ছে। নগরায়ণের কারণে ক্রমেই কমছে জলাশয়। পাশাপাশি চাষের কাজে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জলজ বাস্তুতন্ত্রও ধ্বংস হচ্ছে।
ভেনামি-র মতো উচ্চ ফলনশীল চিংড়ি চাষে উদ্যোগী হতে দেরি করাটাও প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সহ-সভাপতি কামরুল আলম বলেন, 'ভারত ১ লাখ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ১৫ লাখ টন ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন করে। অথচ আমরা ২ লাখ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদন করি মাত্র এক লাখ টন।'
সংগঠনের ৭৫টি সদস্য কারখানার মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ৩০টি। গোটা খাতটি তীব্র চাপে আছে। এ পরিস্থিতিতে টোটাল ফুড প্রসেসিং, এসিআই ফুডস ও অ্যাপেক্স ফুডস-এর মতো রপ্তানিকারকরাও হিমায়িত খাবার তৈরির পথে হেঁটেছে। ক্রমবর্ধমান প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকতে শিল্পক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনার এই বৃহত্তর প্রবণতাই এখন প্রকট।
পুরনো অবকাঠামোতেই নতুন আশা
এই পরিস্থিতিতে হিমায়িত খাবারই রপ্তানিকারকদের ভরসা হয়ে উঠেছে। কারখানার যে প্রোডাকশন লাইলে একসময় মাছ ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত হতো, সেখানে এখন তৈরি হচ্ছে পরোটা, সমুচা ও শিঙাড়া। এর ফলে যেমন কারখানা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে, তেমনি রক্ষা পাচ্ছে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থানও।
এই পটবদল কিন্তু আকস্মিক নয়। সামুদ্রিক খাবার রপ্তানিকারকেরাই এই ক্ষেত্রে পথ দেখাচ্ছেন। কারণ, তারা আগে থেকেই আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলেন। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের ব্যবসার ক্ষেত্রে এইচএসিসিপি-র মতো ব্যবস্থা ও রপ্তানি স্বাস্থ্য সনদপত্র থাকা বাধ্যতামূলক। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোয় এসব আগে থেকেই মজুত রয়েছে।
এছাড়া অনেক বছর ধরে সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানির সুবাদে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গেও তাদের একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এই সুসম্পর্ককেই কাজে লাগাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নতুন রপ্তানিকারকদের তুলনায় অনেক সহজে তারা হিমায়িত খাবারের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে।
আন্তর্জাতিক নিয়মবিধি মেনে চলা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—এই দুই সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই পুরনো কারখানাকে ঢেলে সাজাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। উৎপাদনের ধরনে বদল এনে ইউরোপের মতো সুপ্রতিষ্ঠিত বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে তারা।
কামরুল বলেন, 'শুধু টিকে থাকার তাগিদেই অনেক কারখানা হিমায়িত খাবার রপ্তানির দিকে ঝুঁকেছে। এই বিকল্প না থাকলে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেত।'
হিমায়িত খাবারের এই ব্যবসাকে অবশ এখনই বড় কোনো পালাবদল বলা চলে না। বরং প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে এটি আপাতত ঢাল হিসেবেই কাজ করছে।
সুযোগের হাতছানি, বাধা সেই অবকাঠামো
তবে এই ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিতও রয়েছে। বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বে জীবনযাত্রার ধরন বদলাচ্ছে। তার হাত ধরেই বাড়ছে রেডি-টু-কুক খাবারের চাহিদা। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কর্মজীবী, এমন পরিবার বেড়ে যাওয়ায় রান্নার পেছনে সময় দেওয়ার সুযোগ কমছে। ফলে হিমায়িত খাবার এখন আর নিছক বাড়তি সুবিধা নয়, ক্রমশ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে পরিণত হচ্ছে।
২০২৫ সালের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে হিমায়িত খাবারের বাজার প্রায় ৫৩১ বিলিয়ন ডলারের। বার্ষিক প্রায় ৫.৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৩ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার ৮৪১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে।
সিমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল আহমেদ বলেন, 'যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া পাচ্ছি। গত এক দশকে এই বাজার চোখে পড়ার মতো বড় হয়েছে।'
বিশ্ব বাজারে সহজ প্রবেশাধিকারও এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক যুক্তরাজ্যের ডেভলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম-এর (ডিসিটিএস) সুবিধার কথা তুলে ধরেন। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের অধিকাংশ রপ্তানি পণ্যই শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পায়।
তিনি বলেন, 'শুধু প্রবাসীরাই নন, ব্রিটিশ ভোক্তারাও এখন এসব পণ্য কিনছেন। বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত রপ্তানি করতে পারে, যা রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও প্রকৃত সুযোগ তৈরি করেছে।'
সারাহ কুক জানান, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৯৯.৮ শতাংশ পণ্যই শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়। এর ফলে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়ছে। 'এতে উভয় পক্ষেরই লাভ। বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ব্রিটেনের ভোক্তা—সবার জন্যই এটি ইতিবাচক,' বলেন তিনি।
তা সত্ত্বেও এই খাত এখনও সেভাবে বিকশিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন সারাহ কুক। অবকাঠামোগত ঘাটতি, উদ্ভাবনের অভাব, সীমিত গবেষণা ও দক্ষ শ্রমিকের অভাব—বিশেষত নারী শ্রমিক—এখনও এ খাতের প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ব্রিটিশ বিনিয়োগের ফলে কারখানায় কাজের সুযোগ তৈরি হলেও বৃহত্তর উন্নয়নের জন্য আরও মজবুত অবকাঠামোগত সহায়তা প্রয়োজন।
