আমলাতান্ত্রিক অচলাবস্থা ও চিংড়ি শিল্পের কাঠামোগত সংকট
একসময় যাকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণস্পন্দন এবং জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান 'নীল স্বর্ণ' বলে অভিহিত করা হতো, সেই চিংড়ি শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সামুদ্রিক খাবারের বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রসারিত হলেও বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। গত এক দশকের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের আয় অর্ধ বিলিয়ন ডলার থেকে ধসে পড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এই ভয়াবহ রাজস্ব পতনকে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক ক্ষতি অথবা বিশ্ববাজারের সাময়িক মন্দা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের নীতি-নির্ধারণী ব্যবস্থার চরম অনিয়ম, আন্তর্জাতিক বাজার দর্শনের অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতার এক করুণ বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি এবং নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে আগে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি)। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চিংড়ির ব্র্যান্ডিং করা এবং বিশ্বব্যাপী নতুন বাণিজ্যিক বাজার তৈরির পথ সুগম করার প্রধান আইনি দায়িত্ব ছিল এই দপ্তরের। কিন্তু, বিগত এক দশকে বিশ্বজুড়ে হিমায়িত চিংড়ির চাহিদা কমে গিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে 'রেডি-টু-কুক' চিংড়ি। ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো সময়মতো নিজেদের শিল্প কাঠামো পরিবর্তন করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিশাল বাণিজ্য সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। অন্যদিকে, আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রথাগত রপ্তানি মডেলেই বসে রয়েছে। বাণিজ্যিক শাখাগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার কূটনীতি পরিচালনায় চরম দৃঢ়তার অভাব দেখানোর কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে আমাদের স্থানীয় ব্র্যান্ডকে বিশ্বস্ত হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অপরিকল্পিতভাবে কিছু নগদ সহায়তা দেওয়া হলেও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির বিকাশ ও নতুন বাজার খোঁজার ক্ষেত্রে তাদের দূরদর্শিতার অভাব পরিলক্ষিত হয়।
উৎপাদন কাঠামোর বিশৃঙ্খলা এবং প্রযুক্তিগত স্থবিরতার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর উপকূলীয় জমি চিংড়ি চাষের উপযুক্ত হলেও আজ পর্যন্ত ৮০ শতাংশের বেশি খামার আদিম ও সনাতন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে কোনোমতে টিকে আছে। আধুনিক এবং টেকসই চাষবাদ পদ্ধতি প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে এই মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। যেখানে প্রতিযোগী ভারত, থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনাম জৈব-সুরক্ষিত আধুনিক খামারে প্রতি হেক্টরে সাত থেকে চৌদ্দ হাজার কেজি চিংড়ি ফলন নিশ্চিত করছে, সেখানে আমাদের গড় উৎপাদন ৩০০ থেকে ৪০০ কেজির বৃত্তে আটকে রয়েছে। এই বিশাল উৎপাদনশীলতার ব্যবধান প্রমাণ করে যে মৎস্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারণ কাজ কেবল বার্ষিক নথিপত্র এবং প্রশাসনিক সভা-সমাবেশেই সীমাবদ্ধ রয়েছে । হ্যাচারিগুলোতে রোগমুক্ত ও মানসম্মত পোনার (এসপিএফ) তীব্র ঘাটতি রয়েছে। বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের পোনার দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে অধিদপ্তর কোনো কঠোর নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বর্তমান যুগে সবচেয়ে বড় সংবেদনশীল স্থানটি দখল করে আছে খাদ্য নিরাপত্তা এবং পণ্যের ট্র্যাকিং বা উৎপত্তিস্থল সনাক্তকরণের (ট্রেসেবিলিটি) আধুনিক প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) দায়িত্বজ্ঞানহীনতা স্পষ্ট। ইউরোপ এবং জাপানের মতো উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ করতে হলে প্রতিটি চিংড়ি কোন খামারে উৎপাদিত হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বাজারজাত হয়েছে তার স্বচ্ছ তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ, আমাদের দেশে খামারিদের কোনো ডিজিটালাইজড নিবন্ধন বা কেন্দ্রীয় কোডিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরিতে কোনো একটি নির্দিষ্ট চালানে রাসায়নিকের উপস্থিতি মিললে তার মাশুল গুনতে হয় পুরো দেশের ভাবমূর্তিকে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সার্বক্ষণিক মাঠ তদারকির অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের নির্ভরযোগ্যতা অনেক কমে গেছে।
অর্থনৈতিক শোষণ, অনানুষ্ঠানিক দাদন ও অর্থায়নের অনীহা
অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক শোষণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনেকটাই দায়ী। উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ ক্ষুদ্র চিংড়ি চাষি ব্যাংকিং সেবার পুরোপুরি বাইরে রয়ে গেছেন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কঠিন জামানত নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রান্তিক চাষিরা বাধ্য হয়ে আড়তদার ও স্থানীয় মহাজনদের থেকে চড়া সুদে অনানুষ্ঠানিক দাদন গ্রহণ করেন। এই দাদনচক্র চাষির স্বাধীন বাণিজ্য ক্ষমতা সম্পূর্ণ হরণ করে। অর্থ মন্ত্রণালয় ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য সমবায়ভিত্তিক ঋণ বা জামানতহীন বিশেষ উপকূলীয় বিষয়ক নীতি তৈরি করতে তেমন একটা আগ্রহ দেখায়নি। অন্যদিকে, দেশের ১০৮টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা চার লাখ মেট্রিক টন হলেও কাঁচামালের সংকটে তারা বর্তমানে মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বহীনতাও এখানে স্পষ্ট। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উপকূলীয় নদী ভাঙনের প্রধান শিকার আমাদের চিংড়ি খামারগুলো। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, অতিরিক্ত লোনা পানির অনুপ্রবেশ এবং অতিবৃষ্টিতে খামার প্লাবিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনে কোনো জলবায়ু তহবিল বা টেকসই বীমা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়নি।
ত্রি-স্তম্ভের সমন্বয়হীনতা: হ্যাচারি, খামার ও কারখানা
সংকটের গভীরতা বুঝতে আমাদের দেশের চিংড়ি উৎপাদনের তিনটি প্রধান স্তম্ভের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এই তিনটি ভিত্তি হলো: হিমায়িত প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, খামার পর্যায়ে চাষাবাদ ব্যবস্থা এবং পোনা সরবরাহের জন্য হ্যাচারি শিল্প। সফল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গড়ে তুলতে হলে এই তিনটি স্তম্ভের মধ্যে নিখুঁত সংযোগ থাকা জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে এই তিনটি খাত সম্পূর্ণ আলাদা। হ্যাচারি মালিক জানেন না খামারি ঠিক কতটুকু উন্নত পোনা চান, খামারি জানেন না প্রসেসিং কারখানার সুনির্দিষ্ট চাহিদা কী, আর কারখানা মালিকেরা কাঁচামাল সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বছরের পর বছর অলস বসে আছেন। এই সমন্বয়হীনতাই আমাদের চিংড়ি খাতের মূল সমস্যা। বাংলাদেশে প্রায় ১০৮টি অনুমোদিত ও আধুনিক হিমায়িত প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ৭৮টি কারখানা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক অনুমোদন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই সবগুলো কারখানার মোট বার্ষিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু, বাস্তবে আমরা কী দেখছি? মাঠপর্যায় থেকে পর্যাপ্ত কাঁচা চিংড়ি না পাওয়ার কারণে এই বিশাল কারখানাগুলো তাদের মূল ক্ষমতার ১০ শতাংশের কম ব্যবহার করতে পারছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা এসব ফ্রিজিং প্ল্যান্ট এখন মূলধন ও ব্যাংকের সুদের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কাঁচামাল না পেয়ে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি কাজ হারিয়ে বেকার হচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক।
অন্যদিকে, চাষাবাদ বা খামার খাতের দিকে তাকালে এক অদক্ষ চিত্র ফুটে উঠে। আমাদের দেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় দুই লাখ ৬২ হাজার হেক্টর জমি চিংড়ি চাষের অধীনে রয়েছে। এই জমিতে প্রায় সাত লাখ ৭০ হাজার শ্রমিক সরাসরি যুক্ত আছেন। জমি এবং চাষির সংখ্যা বিচারে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি উৎপাদন অঞ্চল। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় না থাকায় এই ক্ষুদ্র চাষিরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে চিংড়ির ফলন কম হয়।
পোনা উৎপাদনের ক্ষেত্রটিতেও একই সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৭টি বাগদা চিংড়ি হ্যাচারি গড়ে উঠেছে, যাদের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দুই হাজার কোটিরও বেশি পোনা। অথচ, সনাতন পদ্ধতির চাষের কারণে উন্নত পোনার চাহিদা কম থাকায় এই হ্যাচারিগুলোর বিশাল ক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যায়। বাজারে ৪৭টির মধ্যে কেবল ৩টি হ্যাচারি বিশ্বমানের রোগমুক্ত (এসপিএফ) পোনা তৈরি করে, আর বাকি ৪৪টি হ্যাচারি এখনো সমুদ্র থেকে ধরা বন্য ব্রুড বা মা-চিংড়ির উপর নির্ভর করে।
বিশ্ববাজারের পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়মকানুন অনেক বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো এখন 'ট্রেসেবিলিটি' বা ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা ছাড়া কোনো খাদ্যপণ্য গ্রহণ করে না। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো এখন প্রতিটি চিংড়ির প্যাকেটে কিউআর কোড যুক্ত করে দিচ্ছে। ক্রেতা ফোনে স্ক্যান করলেই খামার ও চাষির নাম-পরিচয় দেখতে পান। অথচ বাংলাদেশে চাষিদের কোনো ডিজিটালাইজড নিবন্ধন কোড নেই, কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ নেই। ফলে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মান ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা না পেয়ে বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বাজার ব্যবস্থাপনায় আমাদের আরেকটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভুল হলো একটি মাত্র পণ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরতা। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে কেবল 'ব্ল্যাক টাইগার' বা বাগদা চিংড়ির প্রথাগত হিমায়িত রূপ বিক্রি করে গেছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজার দখল করে নিয়েছে কম দামি ও উচ্চ ফলনশীল 'ভ্যানামি' (Vannamei) জাতের চিংড়ি। চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম ভ্যানামি চাষে বিপ্লব ঘটিয়ে বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশে ভ্যানামি জাতের বাণিজ্যিক অনুমোদনের জন্য সরকার ও নীতি-নির্ধারকেরা দীর্ঘ এক দশক সময় নষ্ট করেছেন। ২০১৩ সাল থেকে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা বারবার আবেদন করলেও অবশেষে ২০২৩ সালে এসে ব্যবসায়িক ভ্যানামি চাষের সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সংকট উত্তরণের সুপারিশমালা ও নীতিগত কৌশল
এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী 'নীল স্বর্ণ' শিল্পকে বাঁচাতে হলে এক আমূল কাঠামোগত ও প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু আশ্বাস বা কাগজে প্রকল্প দিয়ে আর চলবে না। এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
একক 'জাতীয় চিংড়ি বিকাশ কর্তৃপক্ষ' গঠন: আন্তঃমন্ত্রণালয় দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক ফাইল-চাপা স্বভাব এবং সমন্বয়হীনতা বন্ধ করতে 'জাতীয় চিংড়ি বিকাশ কর্তৃপক্ষ' নামে একটি একক ক্ষমতাসম্পন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা সরাসরি প্রধান মন্ত্রিপরিষদ বা শীর্ষ তদারকি কাঠামোর অধীনে কাজ করবে।
ডিজিটাইলাজড ট্রেসেবিলিটি ও কিউআর কোড চালু: প্রতিটি খামারি ও ঘেরকে কেন্দ্রীয় ডিজিটালাইজড নিবন্ধনের আওতায় এনে ইউনিক কোডিং দিতে হবে। প্রতিটি রপ্তানিকৃত চালানে কিউআর কোড যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা স্মার্টফোনে স্ক্যান করেই খাবারের মান ও উৎপত্তিস্থল নিশ্চিত হতে পারেন।
প্রান্তিক খামারিদের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন ও ক্লাস্টার ফার্মিং: প্রান্তিক চাষিদের মহাজনী দাদনচক্র থেকে বাঁচাতে বিশেষ উপকূলীয় কৃষি ঋণ সুবিধা চালু করতে হবে। ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন ঘেরগুলোকে 'ক্লাস্টার' বা সমবায় মডেলে একত্র করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে হবে এবং ব্যাংক থেকে সরাসরি জামানতহীন কম সুদে ঋণ দিতে হবে।
চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ বাধ্যতামূলককরণ: প্রসেসিং কারখানাগুলোর অলস সক্ষমতা দূর করতে এবং ভেজাল সৃষ্টিকারী ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কারখানা মালিক ও খামারিদের মধ্যে সরাসরি 'চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ' ব্যবস্থার আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এতে কারখানা সময়মতো মানসম্মত কাঁচামাল পাবে এবং খামারি ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা পাবেন।
প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও শতভাগ এসপিএফ পোনা সুনিশ্চিতকরণ: প্রচলিত সনাতন ঘেরগুলোকে পর্যায়ক্রমে আধা-নিবিড় (সেমি-ইন্টেনসিভ) ও আধা-আধুনিক খামারে রূপান্তর করতে হবে। সমুদ্রের রোগাক্রান্ত বন্য ব্রুড বাদ দিয়ে খামারিদের জন্য শতভাগ রোগমুক্ত এসপিএফ পোনার যোগান সুনিশ্চিত করতে সরকারি হ্যাচারি অবকাঠামো তৈরি ও বেসরকারি হ্যাচারিতে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।
রেডি-টু-কুক পণ্যে রাজস্ব ছাড় ও বৈশ্বিক ব্রান্ডিং: প্রথাগত বরফজাত কাঁচা চিংড়ি রপ্তানির বদলে মূল্য সংযোজিত 'রেডি-টু-কুক' বা প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনে শিল্প মালিকদের বিশেষ রাজস্ব ছাড় ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে "Bangladesh Premium Shrimp" নামে নিজস্ব ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করে এই প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক দপ্তরগুলো যদি এখনই সৎ, সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে বাংলাদেশের ইতিবাচক সম্ভাবনা সৃষ্টি করা এই ঐতিহ্যবাহী 'নীল স্বর্ণ' বিশ্ব বাণিজ্য মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।
লেখক: আশুরা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
- নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
