সংসদে দুই বিল পাস: বয়সসীমা ও গভর্নর ইস্যুতে বিতর্ক
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)—এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বয়সসীমা তুলে দিয়ে জাতীয় সংসদে দুটি বিল পাস হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে বিল দুটি পাস হয়।
বিল পাসের পর বিএসইসি ও আইডিআরএ-তে দক্ষ লোক নিয়োগ এবং আর্থিক খাতের শীর্ষ পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পদায়ন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়। বিতর্কের এক পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানান, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, অর্থনৈতিক খাতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হবে না।
বিলের ওপর আলোচনা ও প্রক্রিয়া
সংসদে অর্থমন্ত্রী 'বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল' এবং 'বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল' আলাদাভাবে পাসের জন্য উত্থাপন করেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ছাড়া অন্য কোনো সদস্য বিল দুটির ওপর জনমত যাচাই বা সংশোধনী প্রস্তাবের নোটিশ না দেওয়ায় কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী অন্যদের আলোচনার সুযোগ ছিল না। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের ওপর কথা বলতে চাইলে স্পিকার কায়সার কামাল প্রথমে বিধি অনুযায়ী সুযোগ দিতে চাননি।
পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, 'আমরা বেশির ভাগ সদস্য এখানে নতুন এসেছি এবং বিধিগুলো রপ্ত করছি।' তিনি অভিযোগ করেন, বিলের কপি দেরিতে পাওয়ায় তারা সময়মতো নোটিশ দিতে পারেননি। তিনি সংসদ সদস্যদের অধিকার রক্ষার স্বার্থে বিল দুটি স্থগিত রাখার অনুরোধ জানালেও স্পিকার জানান যে, সময় মার্জনার এখতিয়ার স্পিকারের আছে এবং গতকালই বিলের রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। এরপর বিল দুটি পাস হয়।
বয়সসীমা ও দক্ষ জনবল নিয়ে বিতর্ক
বিল পাসের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন প্রশ্ন তোলেন, কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে মাথায় রেখে এই বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে কি না। তিনি বলেন, 'যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর নিয়োগ হয়েছে, সেভাবে যদি কোনো বিশেষ ব্যক্তিদের মাথায় রেখে এ দুটি আইনে বয়সের সীমা তুলে ধরা হয় তাহলে অর্থমন্ত্রী যেভাবে দক্ষ লোক নিয়োগের কথা বলেছেন সেটার সঙ্গে বৈপরীত্য দেখা দেবে।' আখতার হোসেন আরও বলেন, 'বিএনপি ২০০১ সালে যখন ক্ষমতায় এসেছিল তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিজেদের মতো করে উপদেষ্টা বসানোর জন্য প্রধান বিচারপতির বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ করেছিল। তারপরে একটা দীর্ঘ ভোগান্তি জাতিকে পোহাতে হয়েছিল।'
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যখন আগের আইন হয়েছিল তখন গড় আয়ু ছিল ৫৭, যা এখন ৭২ বছর হয়েছে। বিশ্বের প্রায় কোথাও এই ধরণের সংস্থায় বয়সসীমা নেই। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতির যে নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হচ্ছে, এখানে যোগ্য, দক্ষ ব্যক্তি যদি আসতে চান, আপনাকে এগুলোকে মাথায় রাখতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো সুযোগ নাই।'
গভর্নর ইস্যু ও রাজনৈতিক নিয়োগ
বিতর্কের এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাকে অপসারণের দাবি জানান। তিনি বলেন, 'যোগ্য লোকদের যোগ্য জায়গায় স্পেস করে দেওয়া দরকার। কিন্তু একটা কথা আছে যে 'মর্নিং সোজ দ্য ডে'। সরকারের দুই মাসে বেসিক যে জায়গাগুলোতে হাত দেওয়া হয়েছে, প্রত্যেকটা জায়গায় জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো 'বেসিক' জায়গার কথা তিনি বলছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে এবং সাবেক গভর্নরকে যে পদ্ধতিতে বিদায় দেওয়া হয়েছে তা জাতি দেখেছে।'
শফিকুর রহমান আরও বলেন, 'এ পর্যন্ত যে সমস্ত জায়গায় পরিবর্তন এসেছে, সেগুলা জনগণ ও গণতন্ত্র কোনোটাই সাপোর্ট করে না। এমনকি খেলার মাঠটা পর্যন্ত আমরা উন্মুক্ত রাখতে পারলাম না। ওখানেও গিয়ে আমরা ঝাঁপাইয়ে পড়লাম।' বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, 'আমরা তো কার ইন্টেনশন কী সেটা দেখতে পারব না। এটা মনের ব্যাপার।'
এর জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান কোনো দলীয় ব্যক্তি নন। গভর্নর কোনো দলের সমর্থক হতে পারেন, কিন্তু তার পারফরম্যান্স অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো।'
তিনি আরও বলেন, 'বিগত কেয়ারটেকার সরকারের সময় যখন বয়স বাড়ানো হয়েছিল, তখন তো আপনারা আপত্তি করেননি। যতবার বিএনপি সরকারে এসেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনে যতগুলো নিয়োগ হয়েছে, সবগুলো ছিল অরাজনৈতিক। যে কারণে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের সময় কোনো সমস্যা হয়নি।'
অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থনৈতিক খাতে কেবল অরাজনৈতিক ও দক্ষ ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
