খালের প্রবাহ বন্ধ: এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই কোমর পানিতে ডুবল চট্টগ্রাম
গতকাল মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই কোমর-সমান পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরী।
চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কারণে খালগুলোর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, তিন বছরের প্রকল্প আট বছরেও শেষ না হওয়া, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, সমন্বয়হীনতা এবং সিটি কর্পোরেশনের দেরিতে খাল পরিষ্কার কার্যক্রম—এসব কারণেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে বৃষ্টি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই নগরীর প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, শোলকবহর, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, হালিশহর, নিউমার্কেট ও তিন পুলের মাথাসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়।
কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সড়কগুলো ছোটখাটো জলাশয়ে পরিণত হয়। অনেক স্থানে যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে, কোথাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বাসাবাড়ি ও দোকানপাটেও পানি ঢুকে পড়ে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কাজ চলমান থাকায় সেখানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে, যা পানি প্রবাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বিশেষ করে এসব খালের সঙ্গে সংযুক্ত এলাকাগুলোতেই জলাবদ্ধতা বেশি দেখা গেছে।
তবে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার টিবিএসকে বলেন, "তিন বছরের প্রকল্প ৮ বছরেও শেষ না হওয়া চরম দায়িত্বহীনতা। এপ্রিল মাসে ভারী বৃষ্টির ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও খাল পরিষ্কার না করা জনগণের সঙ্গে তামাশার শামিল।"
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, আগামী ৩ মে পর্যন্ত হালকা থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর সঙ্গে দমকা হাওয়া, কালবৈশাখী ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সরেজমিনে প্রবর্তক মোড় এলাকায় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে। মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে যান চলাচল ধীরগতির, কোথাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ড্রেন উপচে পানি আশপাশের বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে ঢুকে পড়ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, সামান্য বৃষ্টিতেই এমন জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নগরীর বাসিন্দা মো. আনিস জামাল অভিযোগ করেন, পানির কারণে চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রিকশাভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
রিকশাচালক মো. রফিক বলেন, "খালের কাজের কারণে আগে থেকেই পানি জমে ছিল, বৃষ্টিতে তা আরও বেড়ে গেছে। এখন চলাচল করাই কঠিন।"
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি আরও অভিযোগ করেন, প্রকল্পটি শুরু থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গুরুত্ব পায়নি। ১৯৯৫ সালের মাস্টার প্ল্যানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য যে জলাধার বা রিটেনশন পন্ডের কথা বলা হয়েছিল, বর্তমান প্রকল্পে তার প্রতিফলন নেই। শহরের নিচু জমি ভরাট হয়ে ভবন নির্মাণ হওয়ায় পানি নামার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে জোয়ারের সময় রেগুলেটর বন্ধ থাকলে বৃষ্টির পানি জমার কোনো জায়গা থাকে না। এছাড়া পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু আটকাতে সিল্ট ট্র্যাপগুলোর কাজ এখনো শেষ হয়নি এবং পাম্প হাউজগুলোর সক্ষমতাও পর্যাপ্ত নয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সিডিএর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেলোয়ার মজুমদার বলেন, "ড্রেনেজ বা পানি নিষ্কাশন প্রকল্পে সিডিএর মতো অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া ছিল সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত। সিটি কর্পোরেশন দীর্ঘদিন ধরে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা দেখাশোনা করছে, তাই তাদের দায়িত্ব দিলে জবাবদিহিতা ও জনসম্পৃক্ততা বেশি থাকত।"
তিনি আরও বলেন, "পরবর্তীতে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা জনগণের সরাসরি প্রতিনিধি না হওয়ায় জনদুর্ভোগের বাস্তব চিত্র সব সময় অগ্রাধিকার পায় না। কিছু কাজ এগোলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিত।"
তিনি জরুরি ভিত্তিতে সিটি কর্পোরেশনকে পর্যাপ্ত সরকারি তহবিল বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান, যাতে খালের প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্রুত অপসারণ করা যায়।
এদিকে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আহম্মদ মঈনুদ্দিন টিবিএসকে বলেন, "প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯৪ শতাংশ হলেও সময়মতো আর্থিক বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজের গতি ধীর হয়ে পড়েছে। বরাদ্দের অর্থ হাতে না আসায় ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী নিজ দায়িত্বে কাজ শুরু করলেও আর্থিক সংকটের কারণে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে।"
তিনি দাবি করেন, "আগে যেখানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকত, এখন ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে তা নেমে যাচ্ছে। প্রকল্পের বাকি কাজগুলো দ্রুত শেষ করা গেলে প্রবর্তক মোড়সহ আশপাশের এলাকাগুলো জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে।"
তিনি আরও জানান, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে হিজড়া ও জামালখান খাল পরিষ্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিটি কর্পোরেশনও এই পরিস্থিতির জন্য চলমান প্রকল্পকে দায়ী করেছে। সমালোচকদের মতে, খাল পরিষ্কারে বিলম্বও জলাবদ্ধতা বাড়িয়েছে। কারণ ১৯ এপ্রিল শুরু হওয়া পরিষ্কার কার্যক্রম বৃষ্টি শুরুর আগে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
৪১টি ওয়ার্ডে ৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও বৃষ্টির আগে পরিষ্কার অভিযান শেষ হয়নি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) 'খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন' প্রকল্পটি ২০১৭ সালে অনুমোদনের সময় তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে এখন তা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। শুরুতে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়।
