সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সীতাকুণ্ডে কলেজ মাঠে মাসব্যাপী মেলা, দায় এড়াতে কর্তৃপক্ষের পাল্টাপাল্টি দোষারোপ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী বিজয় স্মরণী কলেজ মাঠে সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে মাসব্যাপী গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার আয়োজনকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহারে সরকারি নিয়ম ভাঙা, প্রশাসনের নজরদারিতে ঘাটতি এবং অনুমতি নিয়ে ভিন্নমত—এসব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, কাদের অনুমতি নিয়ে এবং কী শর্তে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড তৎপরতা শুরু করলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। সব প্রস্তুতি শেষ করে কলেজ মাঠে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মেলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি মো. ফখরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "অনুমোদন না থাকায় মেলাটি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।"
তিনি বলেন, "কলেজ প্রশাসন গভর্নিং বডিকে বিষয়টি জানায়নি। বিষয়টি মূল্যায়ন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শের পর অধ্যক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।"
কলেজের অধ্যক্ষ শিব শংকর শীল টিবিএসকে বলেন, "আমাদের ক্লাস বিকেল ৩-৪টা পর্যন্ত চলে, এরপর মেলা শুরু হয়। অনুমতির বিষয়ে আমি কিছু জানি না। স্থানীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মেলা করছে—এটি প্রশাসনের বিষয়।"
এদিকে সরকারি ব্যাখ্যা সামনে আসার পর স্থানীয় ও রাজনৈতিক মহল থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি উঠে এসেছে, কীভাবে মেলাটি চালু হলো তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
সীতাকুণ্ড সমাজকল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি লায়ন মো. গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করেন, "প্রায় এক মাস ধরে মেলার প্রস্তুতি চলছিল এবং এতে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জড়িত। ইউএনও যেহেতু গভর্নিং বডির সভাপতি, তাই প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের আয়োজন হওয়ার কথা নয়।"
শিক্ষকদের অভিযোগ, কলেজ প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি ও একটি সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থে অনৈতিকভাবে মেলার আয়োজনের সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের দাবি, গত বছরও একই গোষ্ঠী মেলার আয়োজন করে প্রায় ৬০ লাখ টাকা আয় করেছিল। এবারও একই উদ্দেশ্যে তারা মাঠ দখল করে মেলার আয়োজন করে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মোরসালিন টিবিএসকে বলেন, "কলেজ কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের অনুমতিতেই কয়েকদিন ধরে মেলাটি চলেছে। উদ্বোধনের সময় আমাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল এবং আমরা সেখানে উপস্থিত ছিলাম। পরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ডিসি কার্যালয় থেকে মেলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।"
মেলার আয়োজক হেলাল উদ্দিন বাবর টিবিএসকে বলেন, "ডিসি সাহেব মৌখিকভাবে অনুমতি দিয়েছিলেন, তবে পরে নিষেধ করেছেন। এখন ব্যবসায়ীরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। লিখিত অনুমতি পেলে মেলা আবার চালু করা হবে—এমন আশা করছি।"
তবে মৌখিক অনুমতির বিষয়টি অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা টিবিএসকে বলেন, "ডিসি কি কখনো মৌখিকভাবে অনুমতি দেন? আমি এখন পর্যন্ত কোনো মেলার অনুমোদন দিইনি। খবর পাওয়ার পর এসিল্যান্ডকে পাঠিয়ে মেলা বন্ধ করেছি। ডিসির অনুমতি অবশ্যই লিখিত হতে হবে।"
এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে একটি স্পষ্ট নীতিমালা। গত ৩০ মার্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অন্য কোনো কাজে তা ব্যবহার করা যাবে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি মেলার জন্য মাঠ প্রস্তুত করতে প্রায় এক মাস এবং মেলা শেষে পরিষ্কার করতে আরও এক মাস সময় লাগে। ফলে কয়েক মাস ধরে মাঠ খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ কমে যায়, যা তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ দখল করে মেলার আয়োজন শুরু হলো এবং প্রশাসন তা জানত না কেন। স্থানীয়দের দাবি, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়ক সংলগ্ন কলেজ মাঠজুড়ে প্যান্ডেল নির্মাণসহ বিভিন্ন স্থাপনার কাজ চলছিল। স্থানীয়রা জানান, গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে মাসব্যাপী মেলা শুরু হয়। তবে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে এই আয়োজন করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
তাদের আশঙ্কা, মেলার কারণে কলেজের একাডেমিক পরিবেশ ব্যাহত হবে। পাশাপাশি বাইরের লোকজনের অবাধ যাতায়াত নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে এবং মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যানজটও বাড়তে পারে।
এদিকে শুধু সীতাকুণ্ড নয়, চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুলসংলগ্ন শহীদ শাহজাহান মাঠসহ আরও অন্তত দুটি মাঠে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা চলছে বলে জানা গেছে। এসব মাঠের পাশেই এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র থাকায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও পরীক্ষা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
