ঈদের আগে লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালীতে মহামারি রূপ নিল ‘লাম্পি ডিজিজ’, চিন্তায় পশুপালনকারীরা
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার তেওয়ারিগঞ্জ ইউনিয়নের আন্ধারমানিক গ্রামের বাসিন্দা আছিয়া বেগম এখন দিশেহারা; তার প্রতিবন্ধী স্বামীর কোনো আয়-রোজগার নেই, তাই ১৫টি গরু নিয়ে গড়া ছোট খামারটিই ছিল পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে পশুগুলোকে লালন-পালন করছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ এক অজানা রোগে চোখের সামনে ছটফট করে মারা গেল একটি গরু। বাকি ১৪টির মধ্যে আরও চারটি গরুর শরীরে ফুটে উঠেছে মরণঘাতী গুটি। কী দিয়ে বাঁচাবেন বাকি অবলা প্রাণীগুলোকে, সেই চিন্তায় তিনি ম্রিয়মাণ।
এটি কেবল আছিয়া বেগমের একার গল্প নয়। লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর প্রতিটি গ্রামে এখন খামারিদের ঘরে ঘরে একই আর্তনাদ। উপকূলীয় এই দুই জেলায় গবাদিপশুর মাঝে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসজনিত রোগ। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, এটি 'লাম্পি স্কিন ডিজিজ' (এলএসডি) এবং এর সাথে রয়েছে ক্ষুরা রোগ। এক প্রকার ভাইরাসের কারণে এই লাম্পি রোগ হয়। ঘরে ঘরে এখন এলএসডি আক্রান্ত অসুস্থ গরু নিয়ে খামারিদের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে।
খামারিদের দেওয়া তথ্যমতে, মোট গবাদিপশুর প্রায় ২০ ভাগই এখন এলএসডি ভাইরাস ও ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত। আর এলএসডি আক্রান্ত পশুদের প্রায় ৮০ ভাগই মারা যাচ্ছে। ভ্যাকসিন এই রোগের একমাত্র প্রতিষেধক হলেও সরকারিভাবে তা পাওয়া যাচ্ছে না। বেসরকারি কোম্পানির ভ্যাকসিন পাওয়া গেলেও তার মূল্য ১৩ থেকে ১৫ গুণ বেশি। এই অবস্থায় আগামী ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশুপালনকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তেওয়ারিগঞ্জ ইউনিয়নের আন্ধারমানিক গ্রামের কোরবান আলীর ৬টি গরুর মধ্যে ৫টিই মারা গেছে। মনিজা বেগমের মারা গেছে ২টি, নুরুল আমিনেরও ২টি। স্বামী পরিত্যক্তা মিলন বেগমের কষ্ট আরও বেশি। ২০ দিন আগে তার ৪টি গরুর শরীরে হঠাৎ গুটি দেখা দেয়। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে তার লাখ টাকা মূল্যের দুটি গরু মারা যায়। বাকি দুটিও এখন ঘাস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।
কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ গ্রামের ইসমাইল হোসেন শ্যামল আগামী কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ৫টি গরু প্রস্তুত করছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু মারা গেছে, অন্যগুলোও অসুস্থ। একই গ্রামের নাছিমা বেগম তার প্রবাসী স্বামীর পাঠানো অর্থ দিয়ে ৮টি ষাঁড় বড় করছিলেন। এখন ৮টি গরুই অসুস্থ। পা ফুলে গেছে এবং সারা শরীরে গুটি ওঠার পর খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে ৩০ হাজার টাকা খরচ করেও কোনো সুফল পাচ্ছেন না নাছিমা। প্রতিটি পশু মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি দরিদ্র পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। তবুও প্রতিদিনই গরু মারা যাচ্ছে এবং নতুন নতুন গরু আক্রান্ত হচ্ছে।
গ্রামের পর গ্রামজুড়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ার চিত্র বর্ণনা করছেন গ্রামীণ পশু চিকিৎসকরা। পল্লী পশু চিকিৎসক মো. নুরনবী জানিয়েছেন, গত এক মাসে রামগতি উপজেলার চর আলগী ইউনিয়নে তার আশপাশে লাম্পি আক্রান্ত অন্তত ৩০টি গরু মারা গেছে। এখনও শত শত পশু আক্রান্ত হয়ে আছে। রামগঞ্জ উপজেলার পল্লী চিকিৎসক মো. হাসান জানিয়েছেন, গত এক মাসে করপাড়া এলাকায় ৬টি গরু মারা গেছে। একই চিত্র পুরো জেলায়। লক্ষ্মীপুরের পার্শ্ববর্তী জেলা নোয়াখালীতেও ব্যাপক হারে পশু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
লাইভস্টক সার্ভিস প্রোভাইডার (এলএসপি)-এর লক্ষ্মীপুর জেলা সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলা উদ্দিন জানিয়েছেন, তার কর্ম এলাকা কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ গ্রামে গত ২ মাসে অন্তত ১০০ গরু মারা গেছে। সহকর্মীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, পুরো কমলনগর উপজেলায় গত ২ মাসে অন্তত ১ হাজার পশু মারা গেছে, যার বেশিরভাগই বাছুর। বর্তমানে মোট পশুর প্রায় ৫০ ভাগই লাম্পি ও ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত বলে জানান তিনি। পল্লী চিকিৎসকদের দাবি, আক্রান্ত পশুর প্রায় ৮০ ভাগই মারা যাচ্ছে। সরকারি ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই বললেই চলে, আর বেসরকারি ভ্যাকসিনের দাম আকাশচুম্বী।
খামারি আবদুল লতিফ বলেন, এই মরণব্যাধি থেকে পশু বাঁচানোর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না প্রান্তিক খামারিরা। বাজারে সরকারি টিকার দেখা নেই। বেসরকারি কোম্পানিগুলো যে টিকা দিচ্ছে, তার দাম স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি।
খামারি ও পল্লী চিকিৎসকরা জানান, লাম্পি ভাইরাসের প্রতিষেধক এক ভায়াল ভ্যাকসিনে ১০০টি পশুকে দেওয়া যায়, যার সরকারি বাজারমূল্য ছিল ৪০০ টাকা। বর্তমানে এই সরকারি ভ্যাকসিন কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানির ভ্যাকসিন এক ভায়ালে মাত্র ১০টি পশুকে দেওয়া যায়, যার দাম ২ হাজার ৬০০ টাকা। সাথে রয়েছে পল্লী চিকিৎসকের খরচ। আক্রান্ত হওয়ার আগেই দুই দফায় এই ভ্যাকসিন দিতে হয়। কিন্তু বাজারে সরকারি ভ্যাকসিন না থাকায় সাধারণ খামারিরা সময়মতো ভ্যাকসিন দিতে পারছেন না, ফলে রোগটি মহামারি রূপ নিয়েছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম ফজলুল হক বলেন, "লাম্পি রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। আক্রান্ত পশু উচ্চমাত্রার জ্বর, ত্বকে গোটা বা গুটি ওঠা এবং মুখ দিয়ে অনবরত লালা ঝরাসহ নানা উপসর্গে ভোগে। আক্রান্ত কিছু পশু মারা গেছে, তবে আমাদের নিকট সঠিক পরিসংখ্যান নেই।" সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ কম হলেও বেসরকারি ভ্যাকসিন বাজারে আছে বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
তবে সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর জেলার ৪টি গ্রাম ঘুরে খামারিদের সাথে কথা বললে তারা অভিযোগ করেন, রোগটি মহামারি আকারে দেখা দিলেও সরকার পশুপালনকারীদের পাশে নেই। পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নেই এবং সরকারি চিকিৎসকরা কখনো খোঁজও নেননি। ফলে আগামী কোরবানি ঈদে পশু নিয়ে বড় চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা। দ্রুত টিকা সরবরাহ এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা না গেলে হাজারো খামারির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। উল্লেখ্য, লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ নিবন্ধিত পশুখামারি রয়েছে।
