শাস্তি ছাড়া পুরোনো শেয়ারধারীদের ফেরার সুযোগ দিলে ব্যাংক খাত আরও ঝুঁকিতে পড়বে: বিশেষজ্ঞরা
একীভূত দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুরনো শেয়ারহোল্ডারদের আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা ব্যাংকিং খাতকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) এক গোলটেবিল বৈঠকে বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, "একীভূত ব্যাংকগুলো থেকে যারা অর্থ পাচার করেছে, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।"
তিনি বলেন, তাদের শাস্তি দেওয়ার বদলে আবার এসব ব্যাংকের মালিক হিসেবে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। "কেন এই সুযোগ দেওয়া হলো? এমন সুযোগ দিলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি আরও বাড়বে।"
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে শনিবার সকালে ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত "সংশোধিত 'ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, ২০২৬': আবারও কি ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা?" শীর্ষক আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন, রাজনীতিবিদ সারওয়ার তুষার, সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুশতাক খান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, সিএফএ সোসাইটির সভাপতি আসিফ খান এবং বাংলাদেশ-থাই চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শামস মাহমুদ।
তৌফিক আহমদ বলেন, "আইন থেকে মাফ পাওয়ার জন্যই নতুন নতুন আইন করা হয়েছে। পুনঃতফসিলি করতে আগে ডাউনপেমেন্ট করা যেত ১০ শতাংশ দিয়ে, বর্তমানে তা ১ শতাংশ দিয়েই করা যায়। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে সেটা খেলাপি হচ্ছে, আবার প্রয়োজনে মাত্র ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে তা খেলাপি থেকে নিজের নাম সরিয়ে নিচ্ছেন।"
তিনি আরও বলেন, "যতই রেজুলেশন আইন করেন না কেন, ব্যাংক খাতকে যতদিন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত করতে না পারবেন, ততদিন কোন সমাধান আনা সম্ভব হবেনা।'
এ. কে. এম. ওয়ারেসুল করিম বলেন, "ব্যাংক রেজুলেশনের ১৮ (ক) তে যা দেওয়া হয়েছে, তা পুরো উদ্দেশ্যকে হতাশ করেছে। ১০ বছর আগে যারা শেয়ার হারিয়েছেন তাদের পুনরায় শেয়ারে আসার সুযোগ রাখা হয়নি। এখানে সরকার অত্যন্ত নিম্নমানের চালাকি করেছে। অর্থাৎ, ২০১৭ সালে একটি হোটেলে যাদের কাছ থেকে জোড় করে শেয়ার নিয়ে নেওয়া হয়েছে, তারাও আর আসতে পারবেন না।"
অধ্যাপক এ. কে. এম. ওয়ারেসুল করিম বলেন, "২০০৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা। যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। ১৮ মাসে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। কারণ আগে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন করে রাখা হয়েছিল।"
রাজনীতিবিদ সরোয়ার তুষার বলেন, "ভবিষতে এস আলম অন্য নাম ব্যবহার করে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিতে পারে। যেমন এস আলমের আরেকটি নাম মাসুদ, এ নাম ব্যবহার করে সে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। সুতরাং ব্যাংক খাতে এসব খেলাপিদের দ্বারা সমস্যা তৈরি হবে।"
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সোয়াস-এর অধ্যাপক ড. মুশতাক খান বলেন, "ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কোনো ব্যাংক হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ ব্যাংকগুলো পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত; একটি ব্যাংক বন্ধ হলে এর প্রভাব অন্য সুস্থ ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।"
তিনি সতর্ক করে বলেন, "ব্যাংক লুটেরাদের শাস্তি না হলে দ্বিতীয় দফা 'ব্যাংক রান'-এর ঝুঁকি তৈরি হলে তা থামানো কঠিন হবে। এটি পুরো খাতকে অস্থির করে তুলবে।"
