চট্টগ্রামের সিটি কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের পর উত্তপ্ত স্থানীয় রাজনীতি
চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে 'গুপ্ত' শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনার পর চট্টগ্রামের রাজনীতিতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উত্তাপ ছড়িয়েছে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও।
রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ছাত্র সংগঠন দুটি। একসময় যুগপৎ আন্দোলন করা সংগঠন দুটি কার্যত মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে সারাদেশে।
সিটি কলেজে পরীক্ষা চললেও ক্লাস বন্ধ আছে। কলেজ ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী সংঘর্ষ এড়াতে নিউ মার্কেটসহ নগরীর বিভিন্ন মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গতকালের সংঘর্ষে উভয়পক্ষ অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার দাবি করলেও এ ঘটনায় কোতোয়ালী বা সদরঘাট থানায় কোনো মামলা হয়নি।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দিনভর সংঘর্ষের পর রাতে নগরীর পাহাড়তলী এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের একটি কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, ছাত্র শিবিরের আহত নেতাকর্মীদের দেখতে নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে ছুটে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম।
আজ বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে রেলওয়ে স্টেশনের মাঠে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ছাত্রদল। অন্যদিকে জামাল খান এলাকায় নিজেদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পাহাড়তলী কার্যালয় ভাঙচুরের জন্য বিএনপি ও ছাত্রদলকে দায়ী করে বিচার দাবি করেছে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, কলেজের একটি ভবনের দেয়ালে গ্রাফিতিতে 'ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস' লেখা ছিল। সোমবার (২০ এপ্রিল) রাতে ছাত্রদলের কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একদল নেতা-কর্মী সেখানে গিয়ে 'ছাত্র' শব্দটি মুছে দিয়ে 'গুপ্ত' শব্দটি লিখে দেন।
দেয়ালে 'ছাত্র' শব্দটি মুছে 'গুপ্ত' লেখাকে কেন্দ্র করে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয় এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। উভয় পক্ষই হামলার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে।
গতকাল দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও পরে ছাত্রশিবির বিক্ষোভ মিছিল বের করলে আবার উত্তেজনা ছড়ায়। বিকেল চারটার দিকে নগরের নিউ মার্কেট মোড় থেকে শিবিরের মিছিল কলেজের দিকে এলে সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া দেন। এতে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়।
গতকাল বিকেল ৪টার দিকে নিউ মার্কেট ও সিটি কলেজ এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, সংঘর্ষের সময় আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। কলেজের সামনে ছাত্রদল এবং নিউ মার্কেট এলাকায় শিবিরের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র এবং অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা গেছে।
ঘটনার পর ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম নগর দক্ষিণ শাখার প্রচার সম্পাদক জাহিদুল আলম দাবি করেন, তাদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আশরাফ হোসেন নামের এক কর্মীর পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাকে নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম জানান, সামি মো. আলাউদ্দিন নামের এক শিক্ষার্থীকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তার মাথায় সেলাই দেওয়া হয়েছে। পরে পরিবার তাকে বাসায় নিয়ে গেছে।
সংঘর্ষের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নির্ধারিত পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন বলেন, 'ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।'
সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ জানান, সিটি কলেজ, নিউ মার্কেট, চকবাজার, মহসিন কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জড়িতদের শনাক্তে গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু সালেহ মোহাম্মদ নুর উদ্দিন বলেন, 'বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পাবলিক পরীক্ষা চলমান।'
প্রসঙ্গত, ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রাম নাইট কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। একই বছরে ইসলামী ছাত্রশিবির সেখানে কমিটি গঠন করে এবং পরবর্তীতে ছাত্রদলও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর থেকেই ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলমান রয়েছে।
